ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে আবারও বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। রাতভর চলা এই হামলায় অন্তত আটজন নিহত এবং ৩৪ জন আহত হয়েছেন। হামলার তীব্রতায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক বাসিন্দা জীবন বাঁচাতে ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশন ও নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যান।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) গভীর রাতে এই হামলার ঘটনা ঘটে। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্ভাব্য একটি বড় রুশ হামলার বিষয়ে দেশবাসীকে সতর্ক করেছিলেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তিনি জানিয়েছিলেন, রাশিয়া নতুন করে বড় আকারের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কিয়েভ সামরিক প্রশাসনের প্রধান তিমুর তকাচেঙ্কো জানিয়েছেন, রাজধানীর প্রায় তিন ডজন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়। হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়েছেন। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানান, আহতের সংখ্যা অন্তত ৩৪ জনে পৌঁছেছে এবং উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
হামলার শুরুতেই মেয়র ক্লিচকো জানান, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন একযোগে কিয়েভের দিকে ছোড়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, একটি নয়তলা আবাসিক ভবন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবনটির ভেতরে কয়েকজন বাসিন্দা আটকা পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঘটনাস্থলে থাকা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা রাজধানীর মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনার কথা জানিয়েছেন। একই সময়ে ইউক্রেনের বিমান বাহিনীও রাজধানীর দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধেয়ে আসার সতর্কবার্তা জারি করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, হামলার সময় বহু মানুষ নিরাপত্তার জন্য ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন। শিশু, নারী ও বয়স্কদের নিয়ে অনেক পরিবার দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষা করে।
এই হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই আয়ারল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। ডাবলিনে আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিনের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী রাশিয়া আরেকটি বড় হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে। তাই দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তিনি দ্রুত ইউক্রেনে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
দেশবাসীর উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি সবাইকে বিমান হামলার সতর্কসংকেত গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করার আহ্বান জানান। তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করা এবং বিশেষ করে শিশু ও পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিয়ে আসছিলেন।
জেলেনস্কি আরও দাবি করেন, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সংঘাত বন্ধে ইউক্রেন বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, রাশিয়া আলোচনার পথ এড়িয়ে সামরিক চাপ বাড়ানোর নীতিই অনুসরণ করে যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, এই আগ্রাসন শুধু ইউক্রেনের জন্য নয়, বরং প্রতিবেশী দেশ এবং সমগ্র ইউরোপের নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
অন্যদিকে, ইউক্রেনে নতুন করে হামলার প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশ পোল্যান্ডও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সীমান্তবর্তী আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশটি সাময়িকভাবে যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই হামলা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এখনো শান্তিপূর্ণ সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছায়নি। বরং উভয় পক্ষের সামরিক ও কূটনৈতিক অবস্থান ক্রমেই আরও কঠোর হয়ে উঠছে। এর ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা যেমন বাড়ছে, তেমনি ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

