মিয়ানমার এখন শুধু একটি রাজনৈতিক সংকটের নাম নয়; এটি ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের এক ভয়াবহ উদাহরণে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর যে অস্থিরতার শুরু হয়েছিল, পাঁচ বছর পেরিয়ে সেটি আজ দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে সংঘাত-সম্পর্কিত সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর পেছনে আছে ভেঙে যাওয়া পরিবার, ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রাম, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং এক পুরো জাতির দীর্ঘশ্বাস।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, আগের মতোই কয়েক মাসের বিক্ষোভ, দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি হয়তো স্থির হয়ে যাবে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। শহরের রাস্তায় আন্দোলন দমন করতে সেনাবাহিনী কঠোর শক্তি ব্যবহার করলে বহু তরুণ, ছাত্র, অধিকারকর্মী ও সাধারণ মানুষ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথ ছেড়ে সশস্ত্র প্রতিরোধের দিকে এগিয়ে যায়। এরপর তারা পাহাড়ি ও সীমান্তবর্তী এলাকায় আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করে।
মিয়ানমারের সংকট বোঝার জন্য একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি আগে থেকেই জাতিগত সংঘাতে জর্জরিত ছিল। বহু দশক ধরে বিভিন্ন সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে স্বায়ত্তশাসন, অধিকার ও নিরাপত্তার দাবিতে লড়াই করে আসছে। সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেই পুরোনো অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন প্রজন্মের গণতন্ত্রপন্থী প্রতিরোধ। ফলে মিয়ানমারের সংঘাত আর কেবল সেনাবাহিনী বনাম রাজনৈতিক বিরোধীদের লড়াই থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে বহুস্তরীয়, জটিল এবং বিস্তৃত এক গৃহযুদ্ধ।
বর্তমানে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়। কোথাও জাতিগত বাহিনী লড়ছে, কোথাও স্থানীয় প্রতিরোধ যোদ্ধারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাচ্ছে, আবার কোথাও ছোট ছোট গোষ্ঠী নিজেদের এলাকা রক্ষার নামে অস্ত্র হাতে নিয়েছে। এই বিচ্ছিন্ন ও বহুমুখী সংঘাতের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। কোনো একক নেতৃত্ব, একক আলোচনার টেবিল বা সহজ রাজনৈতিক সমাধান এখানে দেখা যাচ্ছে না। ফলে যুদ্ধ থামানোর পথও হয়ে উঠেছে অত্যন্ত কঠিন।
সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। গ্রামাঞ্চলে বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং পাল্টা সহিংসতার কারণে লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, মিয়ানমারের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছেছে। অনেক পরিবার একই দেশে থেকেও নিজের গ্রাম, জমি, কাজ ও সামাজিক নিরাপত্তা হারিয়েছে। কেউ জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে, কেউ সীমান্তের দিকে ছুটেছে, কেউ আবার শহরের প্রান্তে অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছে।
খাদ্যসংকটও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। যুদ্ধের কারণে কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে, বাজারব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক এলাকায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দারিদ্র্য শুধু বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন সাধারণ নাগরিকের জন্য প্রতিদিনের জীবন হয়ে উঠেছে টিকে থাকার লড়াই। স্কুল বন্ধ, হাসপাতাল অচল, কাজের সুযোগ কম, নিরাপত্তা নেই—সব মিলিয়ে একটি প্রজন্ম অনিশ্চয়তার মধ্যে বড় হচ্ছে।
জান্তা সরকার নিজেকে টিকিয়ে রাখতে একদিকে সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক বৈধতা দেখানোর চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সামরিক পরিচয় থেকে সরে বেসামরিক নেতৃত্বের ছদ্মরূপে নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিরোধী দল, গণতন্ত্রপন্থী শক্তি এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশ এই প্রক্রিয়াকে গ্রহণযোগ্য মনে করছে না। কারণ নির্বাচনের পরিবেশ ছিল নিয়ন্ত্রিত, প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তিকে বাইরে রাখা হয়েছিল এবং বিরোধী কণ্ঠকে দমন করা হয়েছে।
এদিকে সামরিক বাহিনী জনবল ঘাটতি পূরণে বাধ্যতামূলক নিয়োগের পথেও হাঁটছে। তরুণদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নেওয়ার চেষ্টা সমাজে নতুন ক্ষোভ তৈরি করেছে। অনেক যুবক দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছে, কেউ লুকিয়ে আছে, কেউ আবার উল্টো প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে। ফলে যে পদক্ষেপ সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করার কথা, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে জনবিরোধী ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
তবে সামরিক বাহিনী পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েছে—এমন ভাবাও ঠিক হবে না। ২০২৩ সালের শেষের দিকে বিদ্রোহী জোটের বড় অভিযানে সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়েছিল। অনেক এলাকায় তারা নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল। কিন্তু পরে কূটনৈতিক সমর্থন, বিশেষ করে আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক এবং কিছু জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে জান্তা সরকার কিছুটা অবস্থান পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে। এর অর্থ, যুদ্ধ একপাক্ষিকভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে না; বরং উভয় পক্ষই বিভিন্ন সময়ে সুবিধা ও চাপের মধ্যে পড়ছে।
মিয়ানমারের এই যুদ্ধ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হয়ে নেই। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড সীমান্তে শরণার্থী প্রবাহ, নিরাপত্তা উদ্বেগ, মাদক পাচার, অস্ত্র চলাচল এবং সীমান্তবর্তী অপরাধচক্রের বিস্তার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গা সংকট আগে থেকেই বড় চাপ। এর সঙ্গে মিয়ানমারের নতুন অস্থিরতা যুক্ত হওয়ায় সীমান্ত নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য—সব ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক রাজনীতি। মিয়ানমার ভৌগোলিকভাবে এমন এক জায়গায় অবস্থিত, যেখানে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনা প্রভাবের সংযোগ রয়েছে। ফলে দেশটির অস্থিরতা শুধু মানবিক প্রশ্ন নয়, কৌশলগত প্রশ্নও। বিভিন্ন শক্তি নিজেদের নিরাপত্তা, বাণিজ্যপথ, সীমান্ত স্থিতি এবং প্রভাব বজায় রাখতে মিয়ানমারের পরিস্থিতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—কবে এই যুদ্ধ থামবে?
দুঃখজনকভাবে, শান্তির পথ এখনো পরিষ্কার নয়। জান্তা সরকার আলোচনার কথা বললেও বিরোধীরা তা বিশ্বাস করছে না। বিরোধী শক্তি সামরিক শাসনের অবসান ছাড়া স্থায়ী সমাধান দেখছে না। জাতিগত গোষ্ঠীগুলোরও আলাদা আলাদা দাবি আছে। কেউ স্বায়ত্তশাসন চায়, কেউ নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চায়, কেউ কেন্দ্রীয় সামরিক নিয়ন্ত্রণের অবসান চায়। এত ভিন্ন স্বার্থের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা কঠিন, তবে অসম্ভব নয়—যদি বাস্তব আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়।
মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের একটি কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়: বন্দুক দিয়ে ক্ষমতা দখল করা যায়, কিন্তু একটি দেশ শাসন করা যায় না। সামরিক শক্তি দিয়ে শহর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, কিন্তু মানুষের বিশ্বাস অর্জন করা যায় না। পাঁচ বছরের রক্তপাত দেখিয়ে দিয়েছে, দমননীতি শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধকে আরও গভীর করে। আর যখন রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই সংকট সীমান্ত পেরিয়ে পুরো অঞ্চলের সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
মিয়ানমারের সামনে এখন দুই পথ। একদিকে আরও দীর্ঘ যুদ্ধ, আরও বাস্তুচ্যুতি, আরও মৃত্যু এবং আরও ভাঙন। অন্যদিকে আছে কঠিন হলেও প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমঝোতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা এবং জনগণের ইচ্ছাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পথ। কোন পথে দেশটি যাবে, তা নির্ভর করবে শুধু জান্তা বা বিদ্রোহীদের ওপর নয়; আঞ্চলিক শক্তি, আন্তর্জাতিক চাপ এবং মিয়ানমারের জনগণের দীর্ঘ লড়াইও সেখানে বড় ভূমিকা রাখবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—এক লাখের বেশি মৃত্যু কোনো দেশের জন্য সাধারণ ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রের গভীর সংকটের চূড়ান্ত সংকেত। মিয়ানমার যদি দ্রুত রাজনৈতিক সমাধানের পথে না হাঁটে, তাহলে এই যুদ্ধ আরও বহু বছর ধরে দেশটিকে ক্ষতবিক্ষত করতে পারে। আর সেই ক্ষত শুধু মিয়ানমারের মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তার ছায়া পড়বে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা, মানবিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার ওপর।

