ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত এই কর্মসূচিকে ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠান হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে ইরানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং প্রতিবেশী ইরাকের পবিত্র নগরীগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত এই আয়োজনকে ঘিরে নিরাপত্তা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক অতিথিদের স্বাগত জানাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির স্মরণে ছয় দিনব্যাপী এই রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি ইরানের পাশাপাশি প্রতিবেশী ইরাকের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহরেও অনুষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা জানানো হবে।
সূচি অনুযায়ী, আগামী শনিবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রার্থনা চত্বরে কেন্দ্রীয় জানাজার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির সূচনা হবে। এরপর সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কজুড়ে একটি শোকমিছিল বের হবে। এই মিছিল পর্যায়ক্রমে ৭ জুলাই পবিত্র শহর কোমে পৌঁছাবে। পরে কর্মসূচি ইরাকের ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ নজফ ও কারবালা শহরে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মানুষের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৯ জুলাই আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মরদেহ তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে নেওয়া হবে। সেখানেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হবে। ইরানের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের পাশাপাশি বিশ্বের নানা দেশ থেকেও বিপুলসংখ্যক শোকাহত ব্যক্তি, ধর্মীয় নেতা এবং সরকারি প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরানের কর্তৃপক্ষের ধারণা, জানাজা ও দাফনের বিভিন্ন পর্বে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন। এত বিপুল জনসমাগমের সম্ভাবনা বিবেচনায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে এবং অনুষ্ঠানস্থলগুলোতে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই অনুষ্ঠান ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, রাশিয়া, চীন, পাকিস্তান, ভারত, জর্জিয়া ও কিউবাসহ ৩০টিরও বেশি দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনে অংশ নেবেন। পাশাপাশি বিশ্বের প্রায় ৯০টি দেশের ধর্মীয় নেতাদের উপস্থিতিও প্রত্যাশা করছে তেহরান।
এরই মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে জানিয়েছেন, তিনি নিজেও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে শুধু রাষ্ট্রীয় নয়, আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি ঘটনাতেও পরিণত করেছে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের এক হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে ইরান দাবি করে। এরপর থেকেই দেশজুড়ে শোকের আবহ বিরাজ করছে। এখন তাঁর শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে যে রাষ্ট্রীয় আয়োজন করা হচ্ছে, তা শুধু একজন নেতার দাফন অনুষ্ঠান নয়, বরং ইরানের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে ইরান একদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের বার্তা দিতে চাইছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও কূটনৈতিক সম্পর্কের শক্তি তুলে ধরার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদের অংশগ্রহণ সেই বার্তাকে আরও জোরালো করে তুলতে পারে।

