ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর তাঁর দাফনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী ৯ জুলাই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে দীর্ঘ এই সময়জুড়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি প্রশ্ন—মৃত্যুর পর এতদিন ধরে তাঁর মরদেহ কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল?
খামেনির মৃত্যুর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা তৈরি হলেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করেনি তেহরান। ফলে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও কৌতূহল বাড়তে থাকে।
এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জর্জ ওয়াশিংটন প্রোগ্রামের চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী গবেষক ড. মোহাম্মদ ওমর বলেন, খামেনির মরদেহ রাসায়নিক উপায়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে মনে করার কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। তাঁর ধারণা, মরদেহ বিশেষ শীতলীকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা দীর্ঘ সময় দাফন বিলম্বিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ইসলামী বিধান অনুযায়ী রাসায়নিক উপায়ে মরদেহ সংরক্ষণ বা বিশেষ তরল পদার্থ ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের প্রচলন নেই। বিশেষ করে ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য নয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে শিয়া ধর্মীয় আইনের আলোকে, দাফন বিলম্বিত হলে শীতলীকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে মরদেহ সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
ড. মোহাম্মদ ওমরের মতে, যদি মরদেহ সম্পূর্ণ অক্ষত ও জনসমক্ষে প্রদর্শনের উপযোগী অবস্থায় থাকত, তাহলে শেষ বিদায়ের কর্মসূচি বারবার পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতো না। একইভাবে দাফনের স্থান ও সময় নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অনিশ্চয়তাও তৈরি হতো না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিষয় থেকে ধারণা করা যায় যে মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব হলেও তা দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে প্রদর্শনের উপযোগী অবস্থায় ছিল না।
এদিকে খামেনির শেষ বিদায়কে কেন্দ্র করে ইরানে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার এবং প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জনগণের প্রতি শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানে ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ইরানের কর্মকর্তাদের ধারণা, জানাজা ও দাফনের বিভিন্ন পর্বে এক কোটি ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে। এ কারণে রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিপুল জনসমাগম সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
একই সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রতিও কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায় অনুষ্ঠানের সময় যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে তেহরান সতর্ক করে দিয়েছে যে, পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার যেকোনো প্রচেষ্টার জবাব দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামের অভিযানের অংশ হিসেবে তেহরানে নিজ বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন বলে ইরান দাবি করে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি টানা ৩৬ বছর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দেশটির রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও কৌশলগত নীতিনির্ধারণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির মরদেহ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের বিষয়টি শুধু প্রযুক্তিগত বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ধর্মীয় বিধান, রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই তাঁর দাফনকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তার পেছনে কেবল একজন নেতার বিদায় নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

