যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে যেখানে পদ, চেয়ার আর ক্ষমতা খুব বেশি দিন কারও হাতে থাকে না, সেখানে একজন বাসিন্দা আছেন যিনি একেবারেই নড়েন না। তিনি বক্তৃতা দেন না, ভোট চান না, সংবাদ সম্মেলন করেন না। তবু তাঁর উপস্থিতি যেন সবার চেয়ে স্থায়ী। তিনি হলেন ল্যারি, ডাউনিং স্ট্রিটের বিখ্যাত বিড়াল।
ল্যারির গল্প শুরু হয় ২০১১ সালে। তখন তাঁকে ব্যাটারসি ডগস অ্যান্ড ক্যাটস হোম থেকে আনা হয়েছিল ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে। উদ্দেশ্য ছিল খুব সাধারণ—ইঁদুরের ঝামেলা সামলানো। কিন্তু কে জানত, এই সাধারণ দায়িত্ব একসময় তাঁকে ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে স্থায়ী মুখে পরিণত করবে!

ল্যারি আসার পর ডাউনিং স্ট্রিটের কালো দরজা দিয়ে একে একে অনেক নেতা ঢুকেছেন, আবার বেরিয়েও গেছেন। ডেভিড ক্যামেরন এসেছিলেন, চলে গেছেন। এরপর থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক, কিয়ার স্টারমার—নেতৃত্ব বদলেছে বারবার। কিন্তু ল্যারি? তিনি ঠিকই রয়ে গেছেন নিজের জায়গায়।
মানুষের রাজনীতিতে যত অস্থিরতা, ল্যারির জীবনে তত শান্তি। কেউ সরকার গঠন করছে, কেউ পদত্যাগ করছে, কেউ জরুরি বৈঠকে দৌড়াচ্ছে—আর ল্যারি হয়তো দরজার সামনে বসে ভাবছে, “এই মানুষগুলো এত ব্যস্ত কেন?”
সরকারিভাবে ল্যারির পদবি হলো মন্ত্রিপরিষদ দপ্তরের প্রধান ইঁদুর-শিকারি। শুনতে যতটা গম্ভীর, বাস্তবে বিষয়টি আরও মজার। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে আছে অতিথিদের স্বাগত জানানো, নিরাপত্তা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা, আর পুরোনো আসবাব ঘুমানোর জন্য আরামদায়ক কি না তা পরীক্ষা করা। শেষ কাজটিতে তিনি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি দক্ষ।

তবে ল্যারিকে শুধু ইঁদুর ধরার বিড়াল ভাবলে ভুল হবে। তিনি এখন ডাউনিং স্ট্রিটের এক ধরনের প্রতীক। ব্রিটিশ রাজনীতির ঝড়ঝাপটার মধ্যে তিনি যেন নীরব স্থিতিশীলতা। প্রধানমন্ত্রী বদলায়, মন্ত্রিসভা বদলায়, নীতি বদলায়, স্লোগান বদলায়—কিন্তু ল্যারি নিজের জায়গা ছাড়েন না।
তাঁর জনপ্রিয়তার বড় কারণও এটাই। তিনি কোনো দলের নন, কোনো প্রচারণার অংশ নন, কাউকে খুশি করার চেষ্টা করেন না। ক্যামেরার সামনে তিনি যেমন খুশি তেমনই থাকেন। কখনও দরজার সামনে বসে থাকেন, কখনও সাংবাদিকদের সামনে হাঁটেন, কখনও গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের চেয়েও বেশি মনোযোগ কাড়েন। রাজনীতিবিদদের যেখানে প্রতিটি হাসি হিসাব করে দিতে হয়, ল্যারি সেখানে সম্পূর্ণ নিজের মতো।

আরেকটা মজার বিষয় হলো, ল্যারি কোনো প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত পোষা প্রাণী নন। তাই একজন প্রধানমন্ত্রী বিদায় নিলেই তাঁর ব্যাগ গুছিয়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হয় না। ডাউনিং স্ট্রিটই তাঁর বাড়ি, তাঁর অফিস, তাঁর রাজ্য। বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীদের জন্য বাড়িটি অস্থায়ী, কিন্তু ল্যারির জন্য প্রায় স্থায়ী।
ল্যারির বয়স এখন অনেক হয়েছে, তবু তাঁর ভাবভঙ্গিতে সেই পুরোনো আত্মবিশ্বাস আছে। যেন তিনি জানেন, এই বাড়ির আসল অভিজ্ঞ বাসিন্দা তিনিই। নতুন প্রধানমন্ত্রী আসুক, নতুন পরিকল্পনা আসুক, নতুন সংকট আসুক—ল্যারি সবকিছু দেখবেন, একটু হাই তুলবেন, তারপর হয়তো আবার ঘুমিয়ে পড়বেন।
শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো ল্যারির কাছ থেকেই আসে। ক্ষমতা ধরে রাখতে সব সময় ভাষণ লাগে না। কখনও কখনও দরজার পাশে শান্তভাবে বসে থাকাও যথেষ্ট।
অবশেষে ডাউনিং স্ট্রিটে কিছুটা স্থিতিশীলতা পাওয়া গেছে—তাও আবার চার পায়ে।

