ইউক্রেন যুদ্ধের পাঁচ বছরে পা দেওয়ার পর রাজধানী কিয়েভ আবারও দেখল এক বিভীষিকাময় রাত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কেঁপে উঠেছে পুরো শহর। একের পর এক বিস্ফোরণে বহু আবাসিক ভবন, অবকাঠামো এবং মানবিক সহায়তা কেন্দ্র ধ্বংস হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত এবং ৯১ জন আহত হয়েছেন। বছরের মধ্যে কিয়েভে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাতভর সাইরেন, বিস্ফোরণ এবং আগুনের আতঙ্কে হাজারো মানুষ ঘর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন ভূগর্ভস্থ মেট্রো স্টেশন ও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে। যুদ্ধের শুরু থেকে কিয়েভ বহুবার হামলার শিকার হলেও, এবারের আক্রমণের ব্যাপকতা ও ক্ষয়ক্ষতি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ইউক্রেনের জরুরি পরিষেবা জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া আরও কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধারের পর নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩০ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ৯১ জন, যাদের মধ্যে শিশু, চিকিৎসাকর্মী এবং অ্যাম্বুলেন্স চালকরাও রয়েছেন।
কিয়েভের সামরিক প্রশাসনের প্রধান তৈমুর তকাচেঙ্কো জানিয়েছেন, উদ্ধারকারী দল বিরামহীনভাবে কাজ করছে। তার ভাষায়, ধ্বংসস্তূপ পুরোপুরি সরানোর আগে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা জানা সম্ভব নয় এবং মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
কিয়েভ সিটি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় রাজধানীর প্রায় ১৩০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বহুতল আবাসিক ভবন, বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।
একটি নয়তলা আবাসিক ভবন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেখানে ধ্বংসস্তূপের নিচে বহু মানুষ আটকা পড়েছিলেন। বিস্ফোরণের পর ভবনের বড় অংশ ধসে পড়ে এবং আশপাশের এলাকাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।
হামলার পর আয়ারল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে দ্রুত দেশে ফিরে আসেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে বলেন, ইউক্রেনের মিত্ররা যদি প্রতিশ্রুত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সময়মতো সরবরাহ করত, তাহলে এত বড় ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারত।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেন অতিরিক্ত কিছু চাইছে না; বরং যে সহায়তার প্রতিশ্রুতি আগে দেওয়া হয়েছিল, সেটিই বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে।
জেলেনস্কি আরও জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য ন্যাটো সম্মেলনে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া রাতভর ৭৪টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৪৯৬টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
বিমানবাহিনীর মুখপাত্র ইউরি ইহনাত জানান, এবারের হামলায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি। একই সঙ্গে সেগুলো প্রতিহত করার সক্ষমতাও আগের তুলনায় কম ছিল।
তার মতে, বর্তমানে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির কারণে ইউক্রেন আকাশ প্রতিরক্ষায় বড় ধরনের চাপে রয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে।
মস্কোর দাবি, তাদের লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বিমানবন্দর। রাশিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
ক্রেমলিন আরও জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অভিযানের বিস্তারিত জানানো হয়েছে এবং যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে সামরিক চাপ অব্যাহত থাকবে।
হামলার পর কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো রাজধানীতে শোক দিবস ঘোষণা করেছেন।
প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই শহরের বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার এক রাতেই তাদের বাসস্থান হারিয়েছে।
ইউক্রেনীয় রেড ক্রস জানিয়েছে, কিয়েভে তাদের মানবিক সহায়তা গুদাম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য সংরক্ষিত প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার সামগ্রী নষ্ট হয়েছে।
এদিকে হামলায় ইউক্রেনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োকেমিস্ট্রি-এর অত্যাধুনিক গবেষণাগারও ধ্বংস হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, এটি শুধু ভবনের ক্ষতি নয়; বরং দেশের চিকিৎসা ও জীববিজ্ঞান গবেষণার জন্যও বড় ধাক্কা।
হামলার পর ইউক্রেনের প্রতিবেশী এবং ন্যাটো সদস্য পোল্যান্ড সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। ফিনল্যান্ডও তাদের আকাশসীমায় সাময়িক বিধিনিষেধ জারি করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কালাস রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক চাপও তত বাড়ানো উচিত।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
হামলার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আবারও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে শান্তি আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে ক্রেমলিন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আশা করছেন। একই সঙ্গে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে গত দুই দিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
কিয়েভে সর্বশেষ এই হামলা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে যুদ্ধ এখন আরও জটিল এবং আরও ধ্বংসাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত পাওয়ার দাবি জানাচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়া আরও বড় আকারে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে।
এ অবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রের লড়াইয়ের পাশাপাশি কূটনৈতিক অঙ্গনও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে যতদিন পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি বা কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি না হবে, ততদিন কিয়েভসহ ইউক্রেনের অন্যান্য শহর একই ধরনের বড় হামলার ঝুঁকিতে থাকবে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

