বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সফরে উত্থাপিত সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডর, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়গুলো নিয়ে ভারত নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের নতুন গতিপথ আঞ্চলিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই এখন নয়াদিল্লির অন্যতম বিবেচ্য বিষয়।
শুক্রবার (৩ জুলাই) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে একাধিক প্রশ্নের মুখোমুখি হন মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল। জবাবে তিনি জানান, প্রতিবেশী দেশগুলোতে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঘটনাবলি ভারত সবসময় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়।
গত মাসের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যান। সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং চীনকে সংযুক্ত করে একটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক করিডর গঠনের প্রস্তাব।
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সংযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি করিডর তৈরির প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানান, বাংলাদেশ প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। তবে এখনো এ বিষয়ে সরকারের কোনো চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারিত হয়নি।
ভারতের সংবাদ ব্রিফিংয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশের সম্ভাব্য যুদ্ধবিমান ক্রয় নিয়ে। ভারতীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, চীন সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বাংলাদেশ কিংবা চীনের কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি।
এ প্রসঙ্গে ভারতের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, এ ধরনের বিষয়ও ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। প্রয়োজন অনুযায়ী যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে সম্ভাব্য এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভারতের নিরাপত্তার জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে কি না, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি।
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের কাছেও সম্ভাব্য যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তবে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন।
চীন সফরের আলোচনায় তিস্তা প্রকল্প এবং মোংলা বন্দরের উন্নয়নও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ দুটি বিষয় নিয়েও ভারতের অবস্থান জানতে চাওয়া হলে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে ভারতের সহযোগিতা দুই দেশের পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতেই পরিচালিত হয়ে থাকে। এসব প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয় এবং তিস্তা প্রকল্প সম্পর্কে ভারতের অবস্থান আগেই বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে। ভবিষ্যতের যেকোনো অগ্রগতি সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মূল্যায়ন করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে একাধিক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের নীতি অনুসরণ করছে। ফলে চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন উদ্যোগগুলো শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

