পাকিস্তানের অস্থিতিশীল বেলুচিস্তান প্রদেশে আবারও বড় ধরনের হামলার ঘটনা সামনে এসেছে। দেশটির উপকূলীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একটি ক্যাম্পে আত্মঘাতী হামলা চালানোর দাবি করেছে নিষিদ্ধ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, এ হামলায় অন্তত ৩০ জন পাকিস্তানি নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
তবে এই দাবির সত্যতা এখনো পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি। একই সঙ্গে স্বাধীন কোনো সূত্র থেকেও হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে ঘটনাটি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য সামনে এলেও সরকারি অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
বেলুচিস্তানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য বেলুচিস্তান পোস্ট জানায়, হামলাটি চালানো হয়েছে গোয়াদর জেলার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় শহর জিওয়ানির পানওয়ান এলাকায় অবস্থিত পাকিস্তান কোস্ট গার্ডের একটি ক্যাম্পে। আরব সাগরসংলগ্ন এই অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বিএলএর মুখপাত্র জিয়ান্দ বেলুচের নামে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংগঠনটির বিশেষ ইউনিট ‘মাজিদ ব্রিগেড’ এই অভিযান পরিচালনা করেছে। তাদের দাবি, এটি ছিল একটি ফিদায়ি বা আত্মঘাতী কমান্ডো অভিযান, যেখানে হামলাকারীরা প্রথমে ক্যাম্পের ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, হামলায় ৩০ জনের বেশি নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও কয়েক ডজন সদস্য আহত হয়েছেন। তবে পাকিস্তানের সামরিক বা বেসামরিক কোনো কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত এই সংখ্যা নিশ্চিত করেনি। এমনকি হামলায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কেও সরকারিভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বিএলএর বক্তব্য, বেলুচিস্তানে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা যে দীর্ঘমেয়াদি সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে আসছে, এটি তারই অংশ। সংগঠনটির দাবি, তারা প্রদেশজুড়ে সামরিক, আধাসামরিক এবং সরকারি বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে অভিযান পরিচালনা করছে।
কেন বারবার উত্তপ্ত হচ্ছে বেলুচিস্তান?
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বেলুচিস্তান আয়তনের দিক থেকে বিশাল হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে তুলনামূলক ছোট। তবে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই অঞ্চল বহু বছর ধরেই সংঘাত, নিরাপত্তা অভিযান এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, বেলুচিস্তানের গ্যাস, খনিজসম্পদ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে স্থানীয় জনগণ ন্যায্য সুবিধা পাচ্ছে না। তাদের দাবি, প্রদেশের সম্পদের ওপর স্থানীয়দের অধিক নিয়ন্ত্রণ এবং আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এই দাবিকে ঘিরেই বিভিন্ন সময় সশস্ত্র সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার বেলুচ লিবারেশন আর্মিকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। শুধু পাকিস্তান নয়, বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশও সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই বিএলএর বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে।
সহিংসতা বাড়ছে উদ্বেগও
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেলুচিস্তানে নিরাপত্তা বাহিনী, সরকারি স্থাপনা এবং কৌশলগত অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে একাধিক প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার দায়ও অনেক ক্ষেত্রে বিএলএ স্বীকার করেছে। আত্মঘাতী বিস্ফোরণ থেকে শুরু করে সামরিক স্থাপনায় সশস্ত্র হামলা—বিভিন্ন ধরনের কৌশল ব্যবহার করছে সংগঠনটি।
সর্বশেষ জিওয়ানির এই হামলার ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এবং হামলার বিস্তারিত পরিস্থিতি সম্পর্কে পাকিস্তান সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না আসা পর্যন্ত পুরো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হওয়া কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে চলা রাজনৈতিক অসন্তোষ, নিরাপত্তা অভিযান এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা মিলিয়ে অঞ্চলটির পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অস্থির। ফলে এ ধরনের হামলা শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং গোটা অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্যও বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।

