রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট ডনবাস অঞ্চলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রাশিয়া দাবি করেছে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর কস্তিয়ানতিনিভকা এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। দীর্ঘদিনের তীব্র লড়াইয়ের পর এই শহর দখল করা সম্ভব হয়েছে বলে শুক্রবার (৩ জুলাই) প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে জানিয়েছেন রুশ সামরিক কর্মকর্তারা।
তবে রাশিয়ার এই দাবির বিষয়ে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রকৃত পরিস্থিতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রুশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, একটি সামরিক কমান্ড পোস্ট পরিদর্শনের সময় প্রেসিডেন্ট পুতিন যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সর্বশেষ তথ্য নেন। সেখানে কস্তিয়ানতিনিভকা দখলকে রাশিয়ার জন্য একটি বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
ডনেৎস্ক অঞ্চলের এই শহরটি শুধু একটি জনবসতিপূর্ণ এলাকা নয়, বরং ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সড়ক ও রেল যোগাযোগের কারণে এটি দীর্ঘদিন ধরে সেনা ও রসদ পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কস্তিয়ানতিনিভকা পুরো স্লোভিয়ানস্ক–ক্রামাতোরস্ক–কস্তিয়ানতিনিভকা প্রতিরক্ষা বলয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে এই শহরের নিয়ন্ত্রণ যে পক্ষের হাতে থাকবে, তারা আশপাশের এলাকায় সামরিক অভিযান পরিচালনায় বাড়তি সুবিধা পেতে পারে।
রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল ভ্যালেরি গেরাসিমভ জানিয়েছেন, দক্ষিণাঞ্চলীয় রুশ বাহিনী পুরো ডনেৎস্ক অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্য নিয়ে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, “স্লোভিয়ানস্ক–ক্রামাতোরস্ক–কস্তিয়ানতিনিভকা প্রতিরক্ষা বলয়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র কস্তিয়ানতিনিভকা এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে।”
২০২২ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই রাশিয়া ডনবাস অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে অন্যতম প্রধান সামরিক লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করে আসছে। ডনেৎস্ক ও লুহানস্ক অঞ্চলকে নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করছে মস্কো।
গত কয়েক মাসে রুশ বাহিনী ডনেৎস্কের বিভিন্ন এলাকায় ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে। কস্তিয়ানতিনিভকা নিয়ে সাম্প্রতিক দাবি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগেও রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, শহরটির বিভিন্ন অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এবার পুরো শহর নিজেদের দখলে এসেছে বলে দাবি করছে তারা।
সামরিক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, ইউক্রেনের দীর্ঘপাল্লার হামলা, বিশেষ করে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ও তেলশিল্পকে লক্ষ্য করে আক্রমণের সংখ্যা বেড়েছে। তাই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নিরাপত্তা বলয় আরও শক্তিশালী ও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু দখল বজায় রাখাই নয়, বরং ভবিষ্যতে আরও প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনাও করছে মস্কো।
রাশিয়ার এই ঘোষণার পরও ইউক্রেনের সরকার বা সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য প্রকাশ করা হয়নি। যুদ্ধ চলাকালে উভয় পক্ষই প্রায়শই বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি করে থাকে। ফলে স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার আগে এমন দাবিগুলো সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি কস্তিয়ানতিনিভকা সত্যিই রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়ে থাকে, তাহলে ডনেৎস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর দিকেও রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার পথ আরও সহজ হতে পারে।
অন্যদিকে, ইউক্রেন পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলবে কি না কিংবা শহরটি পুনর্দখলের চেষ্টা করবে কি না, সেটিই এখন যুদ্ধের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যুদ্ধের তিন বছরেরও বেশি সময় পার হলেও ডনবাস এখনো রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। তাই কস্তিয়ানতিনিভকাকে ঘিরে সর্বশেষ এই দাবি যুদ্ধের গতিপথে নতুন মোড় আনতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।

