জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে, তার আরেকটি কঠিন উদাহরণ দেখা গেল ইউরোপে। মাত্র আট দিনের তীব্র তাপপ্রবাহে ফ্রান্স, বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডসে ৩ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি স্বাভাবিক গ্রীষ্মকালীন গরম ছিল না; বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এমন এক চরম আবহাওয়া, যা মানুষের জীবন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং অবকাঠামোর ওপর একসঙ্গে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
আট দিনের দাবদাহে বিপর্যস্ত ইউরোপ
গত ২০ জুন থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। আবহাওয়াবিদদের ভাষ্য, এই সময়ের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মৌসুমি গড়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল এবং অনেক এলাকায় তা সহনীয় সীমা অতিক্রম করে।
প্রচণ্ড গরমের কারণে বিদ্যুতের ব্যবহার হঠাৎ বেড়ে যায়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যবস্থা, বিভিন্ন জনসেবা এবং নগর অবকাঠামোও নানা সমস্যার মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি ইউরোপের অন্যতম ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, যার প্রভাব শুধু আবহাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতেও এর বড় প্রভাব পড়েছে।
সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ফ্রান্সে
তিন দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে ফ্রান্স। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র আট দিনের তাপপ্রবাহে ২ হাজার ২৫ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানিয়েছেন, নিহতদের বড় অংশের বয়স ৪৫ বছরের বেশি। তিনি সতর্ক করে বলেন, সরকারের হাতে থাকা তথ্যই চূড়ান্ত নয়; প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেলজিয়ামেও নজিরবিহীন প্রাণহানি
১৮ জুন থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত ১১ দিনের মধ্যে বেলজিয়ামে ১ হাজার ২০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৫৩০ জনের বয়স ছিল ৮৫ বছর বা তার বেশি। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ একে অভূতপূর্ব পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করে জানিয়েছে, গ্রীষ্মকালীন দাবদাহে এত বেশি অতিরিক্ত মৃত্যুর ঘটনা এর আগে কখনো দেখা যায়নি।
নেদারল্যান্ডসেও বাড়ছে উদ্বেগ
নেদারল্যান্ডসেও পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আট দিনের তাপপ্রবাহে ৪৮০ জন অতিরিক্ত প্রাণ হারিয়েছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মৃতদের অধিকাংশই ছিলেন ৮০ বছরের ঊর্ধ্বের প্রবীণ নাগরিক, যাদের অনেকেই আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।
কেন বাড়ল মৃত্যুর সংখ্যা?
চিকিৎসকদের মতে, তীব্র গরমে মারা যাওয়া অধিকাংশ মানুষের আগে থেকেই হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট, কিডনি সমস্যা বা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা ছিল। চরম তাপমাত্রা তাদের শারীরিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তাপপ্রবাহ না হলে অনেকের মৃত্যু হয়তো এত দ্রুত ঘটত না। অর্থাৎ, দাবদাহ বিদ্যমান শারীরিক সমস্যাকে মারাত্মক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বার্তা
আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, ইউরোপে এ ধরনের চরম তাপপ্রবাহ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র গরমের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে শুধু মানুষের স্বাস্থ্য নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি, পরিবহন, নগর অবকাঠামো এবং অর্থনীতিও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় এড়াতে শুধু জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বাড়ালেই হবে না; একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নগর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক এই তাপপ্রবাহ আবারও মনে করিয়ে দিল, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

