ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই দেশটির পক্ষ থেকে এসেছে নতুন এক কঠোর বার্তা। ইরানের সেনাবাহিনীর প্রধান কমান্ডার মেজর জেনারেল আমির হাতামি ঘোষণা দিয়েছেন, খামেনির হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং এই ঘটনার জন্য যাদের দায়ী করা হচ্ছে, তাদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
শুক্রবার (৩ জুলাই) রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আয়োজিত রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অপরাধী রাষ্ট্র’ এবং ইসরায়েলকে ‘বিশ্বাসঘাতক জায়নবাদী শাসন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার শাহাদাত দেশটির মনোবলকে দুর্বল করেনি, বরং আরও দৃঢ় করেছে।
আমির হাতামির ভাষ্য অনুযায়ী, খামেনির মৃত্যু ইরানি জাতিকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, শহীদ নেতাসহ সব শহীদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া হবে এবং এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের একদিন অবশ্যই জবাব দিতে হবে।
ইরানের সরকারি অবস্থান অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিন রাজধানী তেহরানে নিজ বাসভবনে অবস্থানকালে ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান। এই ঘটনাকে ইরান শুধু একটি সামরিক হামলা নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও নেতৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছে।
খামেনির দাফন এর আগে মার্চ মাসে হওয়ার কথা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান তীব্র সামরিক সংঘাতের কারণে তা পিছিয়ে যায়। যুদ্ধবিরতির সুযোগ তৈরি হওয়ার পর প্রায় চার মাস পর রাষ্ট্রীয়ভাবে তার জানাজা ও দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ৩ জুলাই থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী শোকানুষ্ঠান, জানাজা ও বিদায় কর্মসূচি চলবে। শনিবার (৪ জুলাই) সকাল থেকে দ্বিতীয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার পর রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা এবং আশপাশের এলাকায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে এক শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়।
ভোর থেকেই বিভিন্ন দিক থেকে মানুষ অনুষ্ঠানস্থলের দিকে আসতে শুরু করেন। কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে হেঁটে অনেককে সেখানে পৌঁছাতে দেখা যায়। তেহরানের বিভিন্ন মেট্রো স্টেশনেও দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন হাজারো মানুষ। অনুষ্ঠান শুরুর আগেই পুরো প্রাঙ্গণ শোকার্ত মানুষের ভিড়ে পূর্ণ হয়ে যায়।
শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বহু মানুষের হাতে ছিল লাল পতাকা, যা ইরানে প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সেখানে উপস্থিত জনতার একটি অংশকে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগান দিতে দেখা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এসব স্লোগান শুধু আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন।
রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি অনুযায়ী, তেহরানে শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠান রোববার পর্যন্ত চলবে। এরপর সোমবার রাজধানীতে জানাজার শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার পবিত্র কোম শহরে, বুধবার ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় শোকানুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। সবশেষে বৃহস্পতিবার মাশহাদে বিদায়পর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর অষ্টম শিয়া ইমাম ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার প্রাঙ্গণে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে দাফন করা হবে।
ইরানের সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এখনও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। খামেনির হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব বারবার প্রতিশোধের অঙ্গীকার করছে। তবে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে বা কবে নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য দেওয়া হয়নি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের বক্তব্য মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ জনমতকে দৃঢ় রাখা, রাষ্ট্রীয় অবস্থান স্পষ্ট করা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তা দেওয়ার কৌশলের অংশ। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

