রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আরও ২০০টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
বর্তমানে ঢাকার ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ৩৭টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা এবং বিভিন্ন এলাকায় ৮০টি প্যান-টিল্ট-জুম ক্যামেরা দিয়ে সার্বক্ষণিক নজরদারি পরিচালিত হচ্ছে। নতুন পর্যায়ে মতিঝিল, উত্তরা, শাহবাগ-আবদুল্লাহপুর সড়ক, পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে (৩০০ ফুট সড়ক) এবং মিরপুর এলাকায় এই প্রযুক্তির সম্প্রসারণ করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে এসব এলাকার বড় একটি অংশকে নতুন নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। ইতোমধ্যে পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়কে ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী চার মাসে ৬০টি, পরবর্তী চার মাসে আরও ৬০টি এবং পরে ধাপে ধাপে বাকি ৮০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান জানিয়েছেন, রাজধানীর পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তির সহায়তায় ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এই ক্যামেরাগুলো শুধু ভিডিও ধারণ করবে না, বরং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনাও শনাক্ত করতে পারবে। কোনো যানবাহন নিয়ম ভঙ্গ করলে সফটওয়্যার তা শনাক্ত করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের তথ্য সংগ্রহ করবে। এরপর দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্য বিষয়টি যাচাই করে ডাকযোগে মামলার নোটিশ পাঠাবেন। পাশাপাশি সরকারি দুটি নম্বর থেকে খুদে বার্তার মাধ্যমেও মামলার তথ্য জানানো হবে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এই ক্যামেরাগুলো বেশ উন্নত। ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে সক্ষম হওয়ায় এগুলো চলমান যানবাহনকে অনুসরণ করতে পারে। অপটিক্যাল জুম প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক দূর থেকেও স্পষ্টভাবে নম্বরপ্লেট শনাক্ত করা সম্ভব হয়। ফলে আইন লঙ্ঘন করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলেও সেটি সহজেই নজরে চলে আসবে।
ডিএমপির ‘স্মার্ট পুলিশিং’ কর্মসূচির আওতায় ভবিষ্যতে রাজধানীজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা, মুখ শনাক্তকারী নজরদারি ব্যবস্থা এবং আধুনিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ট্রাফিক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মোট প্রায় ১২ হাজার ক্যামেরার প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজার ক্যামেরা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করা হবে এবং বাকি ক্যামেরাগুলো অপরাধ তদন্ত ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজে লাগানো হবে।
বর্তমানে মৎস্য ভবন, সুগন্ধা, পুলিশ ভবন, শাহবাগ, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এলাকা, বাংলামোটর, সোনারগাঁও ক্রসিং, বিজয় সরণি, সায়েন্স ল্যাব ও ফার্মগেটসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৩৭টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরা রয়েছে। সব মিলিয়ে ডিএমপির অধীনে বর্তমানে ১১৭টি ক্যামেরা কাজ করছে। অর্থাৎ রাজধানীর প্রায় ১০ শতাংশের কিছু বেশি এলাকা এখন এই প্রযুক্তির আওতায় এসেছে।
গত ৭ মে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় দেড় হাজারের বেশি মামলা করা হয়েছে। এর ফলে যেসব এলাকায় এই ক্যামেরা রয়েছে, সেখানে চালকদের মধ্যে আইন মেনে চলার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে বাসের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে লেন পরিবর্তনের নিয়ম ভঙ্গ, নির্ধারিত লেনে না চলা এবং সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরির মতো অপরাধে অধিকাংশ মামলা হয়েছে। এছাড়া সিগন্যালের নির্ধারিত স্থানে গাড়ি না থামানোর অভিযোগেও বাসের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা হয়েছে। এরপর সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ির বিরুদ্ধে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব এলাকায় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মামলা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। যেসব স্থানে ট্রাফিক সিগন্যাল এখনও কার্যকর নয়, সেখানে সিগন্যাল অমান্যের অভিযোগে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা করার সুযোগও সীমিত। তাই প্রযুক্তির পাশাপাশি সড়ক ব্যবস্থার অবকাঠামোগত উন্নয়নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে কার্যকর সিগন্যাল ব্যবস্থা, উন্নত সড়ক ব্যবস্থাপনা, জনসচেতনতা এবং আইন প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তাহলেই প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট ও ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা কমাতে বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারবে।

