ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রথম দিনেই দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আঘাত হানে বিমান থেকে নিক্ষিপ্ত বোমা। ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই হামলায় অন্তত ১৬৮ শিশু ও ১৪ জন শিক্ষক নিহত হন বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। আহত ও নিহত প্রাপ্তবয়স্কদের সংখ্যা যোগ করলে মোট হতাহতের পরিমাণ প্রায় ২০০ জনে পৌঁছায়।
সাম্প্রতিক মার্কিন সামরিক ইতিহাসে বেসামরিক মানুষের ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে মিনাবের শাজারেহ তাইয়িবা স্কুলে চালানো এই আক্রমণ। কিন্তু কয়েক মাস পর সামনে আসা তথ্য বলছে, এটি শুধু যুদ্ধের অনিবার্য ভুল ছিল না। বরং বহু বছরের পুরোনো গোয়েন্দা তথ্য, সতর্কবার্তা উপেক্ষা, পৃথক তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে যোগাযোগের অভাব এবং বেসামরিক হতাহত ঠেকানোর ব্যবস্থায় জনবল কমিয়ে দেওয়ার সম্মিলিত ফল হতে পারে এই হত্যাকাণ্ড।
মার্কিন সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত তিনটি সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে সিএনএন যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, সেখানে উঠে এসেছে গুরুতর প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যর্থতার চিত্র।
হামলার লক্ষ্য কীভাবে একটি স্কুল হলো
শাজারেহ তাইয়িবা স্কুলটি যে স্থানে নির্মিত, সেই এলাকা একসময় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর একটি ঘাঁটির অংশ ছিল। ২০১৩ সালের উপগ্রহচিত্রে স্কুল ভবন এবং পাশের সামরিক স্থাপনাকে একই চৌহদ্দির মধ্যে দেখা যায়।
কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে জায়গাটির ব্যবহার বদলে যায়। ২০১৬ সালের উপগ্রহচিত্রে দেখা যায়, স্কুলটিকে সামরিক ঘাঁটির বাকি অংশ থেকে আলাদা করতে একটি নতুন বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের জন্য আলাদা প্রবেশপথও তৈরি করা হয়।
অর্থাৎ, একসময় কোনো সামরিক স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও জায়গাটি পরে স্পষ্টভাবে একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের উপগ্রহচিত্রে। সেখানে স্কুলের মাঠে কয়েক ডজন মানুষকে খেলাধুলা করতে দেখা যায়। বিদ্যালয়টি যে নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছিল এবং সেখানে বেসামরিক মানুষের উপস্থিতি ছিল, এই দৃশ্য তার শক্তিশালী প্রমাণ।
তবু ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই স্থানে হামলার অনুমোদন দেওয়া হয়।
তথ্যভাণ্ডারেই ছিল সতর্কবার্তা
সিএনএনের সঙ্গে কথা বলা সূত্রগুলো জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু বাছাইয়ের জন্য যে তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করেছিল, সেখানে স্পষ্ট সতর্কবার্তা ছিল। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল, ইরান-সংক্রান্ত অনেক গোয়েন্দা তথ্য বহু বছরের পুরোনো এবং হামলার আগে সেগুলো নতুন করে যাচাই করা প্রয়োজন।
কোনো সন্দেহজনক বা পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে একটি স্থানকে হামলার তালিকায় রাখতে হলে একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার বিশেষ অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু যুদ্ধের শুরুতে দ্রুত বিপুলসংখ্যক লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার চাপ ছিল। দুটি সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা দ্রুততার স্বার্থে সতর্কবার্তা পাশ কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন।
অর্থাৎ, তথ্য পুরোনো—এ কথা জানা ছিল। আবার তথ্য যাচাই না করলে বেসামরিক স্থাপনায় হামলার ঝুঁকি রয়েছে—সেই সতর্কতাও ছিল। তারপরও হামলা থামানো হয়নি।
সূত্রগুলোর মতে, এই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত স্কুলটিকে সামরিক লক্ষ্য হিসেবে ধরে নেওয়ার পথ তৈরি করে।
এক তথ্যভাণ্ডারে সতর্কতা, অন্যটিতে নীরবতা
মিনাবের ঘটনাটি শুধু পুরোনো তথ্যের সমস্যা নয়। এটি মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার ভেতরে বিভিন্ন প্রযুক্তি ও তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে সমন্বয়হীনতারও উদাহরণ।
একটি সূত্র জানিয়েছে, একজন বিশ্লেষক আগে থেকেই একটি গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ব্যবস্থায় ওই স্থানের পরিবর্তনের তথ্য লিখে রেখেছিলেন। সেখানে উল্লেখ ছিল, জায়গাটির ব্যবহার বদলেছে এবং এলাকাটি আর আগের মতো সামরিক স্থাপনা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না।
কিন্তু সেই বিশ্লেষণ ব্যবস্থা সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের মূল তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। ফলে একজন বিশ্লেষকের সতর্কতা হামলার অনুমোদন দেওয়া কমান্ডারদের কাছে পৌঁছায়নি।
এই ব্যর্থতা দেখায়, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য শুধু সংগ্রহ করলেই যথেষ্ট নয়। সেই তথ্য সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীর কাছে পৌঁছানো না গেলে তার কোনো কার্যকারিতা থাকে না।
একটি সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন কীভাবে ভুলটি ঘটেছে। তাঁদের কাছে তখন পরিষ্কার হয়ে যায়, পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতেই স্কুলটিকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
যুদ্ধ শুরুর পর শুরু হয় তথ্য হালনাগাদের তাড়াহুড়া
ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা হাজার হাজার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তথ্য নতুন করে যাচাই ও হালনাগাদ করতে শুরু করেন।
কিন্তু অভিযান শুরুর আগে সব তথ্য যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত সময় ছিল না। ফলে তালিকায় থাকা অনেক স্থাপনার বিষয়ে ব্যবহৃত গোয়েন্দা তথ্য ১০ বছরেরও বেশি পুরোনো ছিল।
বিশ্লেষকেরা প্রথমে যেসব লক্ষ্যবস্তু মার্কিন বাহিনীর জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করতে পারে, সেগুলোর তথ্য হালনাগাদে বেশি গুরুত্ব দেন। এর মধ্যে ছিল ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, বিমান এবং স্থান পরিবর্তন করতে সক্ষম সামরিক সরঞ্জাম।
এ ধরনের লক্ষ্যবস্তু দ্রুত অবস্থান বদলাতে পারে বলে এগুলোকে উচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে ভবন, সামরিক ঘাঁটি বা স্থায়ী অবকাঠামোকে তুলনামূলকভাবে কম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সামরিক পরিকল্পনাকারীরা ধরে নিয়েছিলেন, স্থায়ী স্থাপনা যেহেতু স্থান পরিবর্তন করে না, তাই পুরোনো তথ্য ব্যবহার করলেও ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
মিনাবের ঘটনা এই ধারণার ভয়াবহ দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।
একটি ভবন একই জায়গায় থাকতে পারে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার ব্যবহার বদলে যেতে পারে। সামরিক ঘাঁটি স্কুলে, হাসপাতাল আবাসিক ভবনে কিংবা গুদাম জনবসতিতে পরিণত হতে পারে। শুধু ভবনের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকলেই তার সামরিক পরিচয়ও অপরিবর্তিত থাকবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
প্রযুক্তির আধুনিকায়নেও দীর্ঘ বিলম্ব
মার্কিন বাহিনী লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে যে প্রধান তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে আসছে, তার নাম আধুনিকায়িত সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন একটি ব্যবস্থা তৈরির কাজও চলছে, যার নাম মার্স।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, উভয় ব্যবস্থাতেই ইরান-সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের আগে তা হালনাগাদ করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা ছিল।
কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় পুরোপুরি রূপান্তরের কাজ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় কয়েক বছর পিছিয়ে রয়েছে। ফলে পুরোনো আধুনিকায়িত সমন্বিত তথ্যভাণ্ডারই এখনো প্রধান তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এখানে একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যায়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র আধুনিক প্রযুক্তি, উপগ্রহ নজরদারি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক যুদ্ধব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে গর্ব করে। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ হামলার সিদ্ধান্ত এমন একটি ব্যবস্থার তথ্যের ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয়েছে, যার অনেক অংশ ১০ বছরেরও বেশি পুরোনো।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যতই উন্নত হোক, তথ্য হালনাগাদ না থাকলে কিংবা তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা কার্যকর না হলে সেই প্রযুক্তি বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।
বেসামরিক হতাহত ঠেকানোর দলে ৯০ শতাংশের বেশি জনবল কমানো
মিনাবের হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বেসামরিক হতাহত কমানোর কর্মসূচিতে ব্যাপক জনবল সংকোচন।
দুটি সূত্র জানিয়েছে, পিট হেগসেথ প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর দায়িত্বে থাকা কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়।
সামরিক কমান্ডগুলোতে এই কর্মসূচির জনবল ৯০ শতাংশেরও বেশি কমানো হয়েছিল।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী কেন্দ্রীয় কমান্ডে বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি পর্যবেক্ষণের জন্য আগে ১০ সদস্যের একটি দল ছিল। সেই দলকে কমিয়ে মাত্র একজন পূর্ণকালীন কর্মীতে নামিয়ে আনা হয়।
শুধু জনবল কমানোই নয়, হামলার পরিকল্পনা ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণকারী দল থেকেও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি বিশেষজ্ঞদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
এর অর্থ হলো, যেসব কর্মকর্তা একটি হামলায় সাধারণ মানুষ, শিশু, শিক্ষার্থী বা বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি যাচাই করতেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলোতে তাঁদের উপস্থিতি আর ছিল না।
একটি সূত্র জানিয়েছে, কেন্দ্রীয় কমান্ডের কর্মকর্তারা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু হেগসেথের সিদ্ধান্তের কারণে তাঁদের প্রয়োজনীয় জনবল, সময় ও সম্পদ ছিল না।
দ্রুত হামলার চাপ কীভাবে সিদ্ধান্তকে দুর্বল করেছে
সূত্রগুলোর ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, অভিযানের শুরুতে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর দ্রুত কাজ করার প্রচণ্ড চাপ ছিল।
যুদ্ধ শুরুর পর অল্প সময়ের মধ্যে হাজারো লক্ষ্যবস্তু যাচাই, তালিকা প্রস্তুত, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং হামলার অনুমোদন দিতে হচ্ছিল। এই পরিস্থিতিতে যথাযথ যাচাইয়ের পরিবর্তে গতি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
একটি সূত্র অভিযোগ করেছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এমন ব্যক্তিদেরও প্রভাব ছিল, যাঁদের সামরিক বা বেসামরিক সুরক্ষা বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল না। তাঁদের মধ্যে সাবেক বিনিয়োগ তহবিল কর্মকর্তা এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্বও ছিলেন।
তবে শুধু বেসামরিক নেতৃত্বকে দায়ী করলেই পুরো চিত্র পরিষ্কার হয় না। একই সূত্র বলেছে, কেন্দ্রীয় কমান্ডের সামরিক নেতৃত্বও এই দ্রুততার নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর আপত্তি জানায়নি।
এখানে সামরিক জবাবদিহির একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দ্রুত হামলার নির্দেশ দিলেও সামরিক কমান্ডারদের দায়িত্ব লক্ষ্যবস্তু যাচাই করা, যুদ্ধের আইন মানা এবং বেসামরিক ক্ষতি যতটা সম্ভব কমানো।
সতর্কবার্তা জেনেও যদি কমান্ডাররা হামলার অনুমোদন দিয়ে থাকেন, তাহলে ঘটনাটি শুধু প্রযুক্তিগত ভুল নয়; এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতাও।
১৬৮ শিশুর মৃত্যু কি প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল
উপলভ্য তথ্য বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, মিনাবের স্কুলে হামলাটি প্রতিরোধ করার একাধিক সুযোগ ছিল।
প্রথমত, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্যভাণ্ডারে তথ্য পুরোনো বলে সতর্কবার্তা দেওয়া ছিল।
দ্বিতীয়ত, ২০১৬ সালের উপগ্রহচিত্রেই স্কুল ও সামরিক ঘাঁটির মধ্যে স্পষ্ট পৃথকীকরণ দেখা গিয়েছিল।
তৃতীয়ত, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের উপগ্রহচিত্রে স্কুলের মাঠে বেসামরিক মানুষের উপস্থিতি দৃশ্যমান ছিল।
চতুর্থত, একজন গোয়েন্দা বিশ্লেষক জায়গাটির পরিবর্তিত ব্যবহারের বিষয়টি নথিভুক্ত করেছিলেন।
পঞ্চমত, সন্দেহজনক তথ্যের ভিত্তিতে হামলার জন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার অনুমোদন প্রয়োজন ছিল।
এতগুলো সতর্কতার পরও হামলা হয়েছে। ফলে ঘটনাটিকে শুধু অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বলা কঠিন।
বরং এটি এমন একটি ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা, যেখানে সতর্কতা ছিল কিন্তু মানা হয়নি, তথ্য ছিল কিন্তু সংযুক্ত ছিল না, বিশেষজ্ঞ ছিলেন কিন্তু তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং যাচাইয়ের প্রয়োজন ছিল কিন্তু দ্রুততার জন্য তা বাদ দেওয়া হয়েছিল।
হামলার পর ট্রাম্পের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য
হামলার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ঘটনাটির জন্য ইরান দায়ী হতে পারে।
পরে তিনি বলেন, হামলার দায় কার, তা হয়তো কখনোই নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না।
এই বক্তব্য প্রশ্ন তৈরি করে। কারণ মার্কিন বাহিনী যদি ওই এলাকায় হামলা চালিয়ে থাকে এবং নিজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করে থাকে, তাহলে দায় নির্ধারণ অসম্ভব হওয়ার কথা নয়।
সামরিক অভিযানে কোনো ভুল হামলা ঘটলে সাধারণত ব্যবহৃত অস্ত্র, বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ, হামলার সময়, লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের নথি এবং অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের পরিচয় সংরক্ষিত থাকে।
তাই দায় অজানা থাকার বক্তব্যকে অনেকে রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে পারেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর তদন্তের ঘোষণা
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, হামলাটি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হবে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক হতাহত এড়াতে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করেছে।
কিন্তু এই দাবির সঙ্গে সামনে আসা তথ্যের অসংগতি রয়েছে।
যদি বেসামরিক হতাহত ঠেকানোর কর্মসূচির জনবল ৯০ শতাংশের বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, কেন্দ্রীয় কমান্ডের ১০ সদস্যের দলকে একজন কর্মীতে নামিয়ে আনা হয়ে থাকে এবং হামলার পরিকল্পনা দল থেকে বিশেষজ্ঞদের সরিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করা হয়েছে—এ দাবি প্রশ্নের মুখে পড়ে।
হেগসেথের দপ্তরের কাছে এসব জনবল হ্রাস নিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
হোয়াইট হাউসের অবস্থান
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তদন্ত এখনো চলছে এবং যুক্তরাষ্ট্র কখনোই বেসামরিক মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু করে না।
ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করা এবং অবহেলা, পুরোনো তথ্য বা অপর্যাপ্ত যাচাইয়ের কারণে বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার মধ্যে আইনি ও নৈতিক পার্থক্য রয়েছে।
কিন্তু কোনো হামলা ইচ্ছাকৃত না হলেও যদি সতর্কতা উপেক্ষা করা হয়, পর্যাপ্ত যাচাই না করা হয় এবং বেসামরিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করা হয়, তাহলে দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না।
লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পেন্টাগন বিষয়টি কেন্দ্রীয় কমান্ডের কাছে পাঠায়। কেন্দ্রীয় কমান্ড চলমান তদন্তের কথা বলে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
কয়েক মাস পরও তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি
২৮ ফেব্রুয়ারির হামলার পর কয়েক মাস পার হয়ে গেছে। কিন্তু পেন্টাগন এখনো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।
এই বিলম্ব নিহত শিশুদের পরিবার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সন্দেহ বাড়াতে পারে। কারণ সময় যত গড়ায়, প্রত্যক্ষ প্রমাণ, সিদ্ধান্তের নথি এবং দায়িত্ব নির্ধারণের প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তত বাড়ে।
একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্তে অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
কোন কর্মকর্তা হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন? পুরোনো তথ্য ব্যবহারের সতর্কতা কেন উপেক্ষা করা হয়েছিল? উপগ্রহচিত্র নতুন করে পরীক্ষা করা হয়নি কেন? বিশ্লেষকের নথিভুক্ত সতর্কতা হামলা পরিকল্পনাকারীদের কাছে পৌঁছায়নি কেন? বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি বিশেষজ্ঞদের সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন? এবং হামলার আগে বিদ্যালয়ে শিশুদের উপস্থিতি যাচাইয়ের কোনো চেষ্টা করা হয়েছিল কি না?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া তদন্তকে পূর্ণাঙ্গ বলা যাবে না।
যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সীমাবদ্ধতা
মিনাবের ঘটনা যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
নতুন প্রযুক্তি দ্রুত বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থায় দেওয়া তথ্য যদি পুরোনো, অসম্পূর্ণ বা ভুল হয়, তাহলে সিদ্ধান্তও ভুল হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে থেকে সব সময় বুঝতে পারে না যে একটি সামরিক ভবন পরে স্কুলে রূপান্তরিত হয়েছে। এর জন্য হালনাগাদ উপগ্রহচিত্র, মানব বিশ্লেষণ, স্থানীয় তথ্য এবং বাস্তব পরিস্থিতির যাচাই প্রয়োজন।
প্রযুক্তি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু মানবিক বিচার ও জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না।
বিশেষ করে যখন একটি ভুল সিদ্ধান্তে শতাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটতে পারে, তখন শুধু তথ্যভাণ্ডার বা স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
বেসামরিক সুরক্ষা কি কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ
আধুনিক যুদ্ধনীতিতে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা একটি মৌলিক নীতি। সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা, হামলার আগে পর্যাপ্ত তথ্য যাচাই করা এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি সামরিক লাভের তুলনায় অতিরিক্ত কি না, তা মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক।
কিন্তু বাস্তবে যখন দ্রুত হামলা, রাজনৈতিক চাপ এবং লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা বাড়ানোর তাগিদ প্রাধান্য পায়, তখন এই নীতিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
মিনাবের স্কুলে হামলা দেখায়, বেসামরিক সুরক্ষার নীতি শুধু নির্দেশিকায় থাকলেই যথেষ্ট নয়। সেই নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, সময়, নির্ভরযোগ্য তথ্য এবং কমান্ডারদের দৃঢ় অবস্থান প্রয়োজন।
১০ জনের কাজ একজনকে দিয়ে করানো হলে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দল থেকে বিশেষজ্ঞদের সরিয়ে দিলে ভুলের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।
শিশুদের মৃত্যু সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়
১৬৮ শিশু ও ১৪ জন শিক্ষকের মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি শিশুর পরিবার ছিল, ভবিষ্যৎ ছিল এবং বিদ্যালয়ে যাওয়ার স্বাভাবিক অধিকার ছিল।
যুদ্ধের সিদ্ধান্ত সাধারণত রাজনৈতিক ও সামরিক কক্ষে নেওয়া হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় এমন মানুষ, যারা যুদ্ধ শুরু করেনি এবং সামরিক সংঘাতের অংশও নয়।
মিনাবের শিশুদের মৃত্যু দেখায়, একটি পুরোনো নথি, একটি উপেক্ষিত সতর্কতা কিংবা একটি তাড়াহুড়ো করে দেওয়া অনুমোদন কত ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
দায় শুধু একজনের নয়
এই ঘটনার জন্য এককভাবে কোনো কর্মকর্তা বা একটি প্রযুক্তিকে দায়ী করলে মূল সমস্যাটি আড়াল হয়ে যেতে পারে।
এখানে পুরোনো তথ্যভাণ্ডার, অসম্পূর্ণ প্রযুক্তিগত রূপান্তর, বিশ্লেষণ ব্যবস্থার মধ্যে যোগাযোগের অভাব, জনবল সংকোচন, দ্রুত হামলার চাপ এবং সামরিক নেতৃত্বের নীরবতা—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করেছে।
তবে ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা মানে এই নয় যে ব্যক্তিগত দায় নেই।
যে কর্মকর্তা সতর্কতা উপেক্ষা করেছেন, যিনি হামলার অনুমোদন দিয়েছেন, যাঁরা বিশেষজ্ঞ দল কমিয়েছেন এবং যাঁরা তথ্য হালনাগাদ ছাড়াই অভিযান শুরু করেছেন—তাঁদের প্রত্যেকের ভূমিকা স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
স্বচ্ছ তদন্তই এখন সবচেয়ে জরুরি
যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই দাবি করে যে তারা বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে না, তাহলে সেই দাবি প্রমাণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্বাধীন, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত।
শুধু অভ্যন্তরীণ সামরিক তদন্ত যথেষ্ট নাও হতে পারে। কারণ যে প্রতিষ্ঠান হামলা চালিয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানই যদি তদন্তের পুরো নিয়ন্ত্রণ রাখে, তাহলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তদন্ত প্রতিবেদনে হামলার পরিকল্পনা, ব্যবহৃত তথ্য, সতর্কবার্তা, অনুমোদনের ধাপ এবং দায়ী কর্মকর্তাদের ভূমিকা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নিহতদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ, আনুষ্ঠানিক ক্ষমা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর সংস্কারও জরুরি।
মিনাবের শাজারেহ তাইয়িবা স্কুলে ২৮ ফেব্রুয়ারির হামলা আধুনিক যুদ্ধব্যবস্থার একটি নির্মম দুর্বলতা সামনে এনেছে।
একটি স্থাপনা ২০১৩ সালে সামরিক ঘাঁটির অংশ ছিল বলে ২০২৬ সালেও তাকে একইভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। অথচ ২০১৬ সালের মধ্যেই স্কুলটি আলাদা হয়ে গিয়েছিল এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেও সেখানে মানুষের স্বাভাবিক উপস্থিতি দেখা গিয়েছিল।
তথ্যভাণ্ডারে সতর্কতা ছিল। একজন বিশ্লেষক পরিবর্তনের বিষয়টি নথিভুক্ত করেছিলেন। উপগ্রহচিত্রেও পরিবর্তন দৃশ্যমান ছিল। তারপরও হামলা হয়েছে।
ফলে প্রশ্নটি শুধু কে বোমা ফেলেছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো, এতগুলো সতর্কবার্তার পরও কেন কেউ হামলা থামাল না।
১৬৮ শিশুর মৃত্যু কোনো সাধারণ সামরিক ভুল হিসেবে চাপা দেওয়ার বিষয় নয়। এটি এমন একটি ব্যর্থতার প্রতীক, যেখানে যুদ্ধের গতি মানবজীবনের মূল্যকে ছাড়িয়ে গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত দায় নির্ধারণ অসম্পূর্ণ থাকবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অন্তত এটুকু স্পষ্ট করে যে, এই হত্যাকাণ্ড শুধু পুরোনো গোয়েন্দা তথ্যের কারণে ঘটেনি; সেই তথ্য পুরোনো জেনেও যারা তা ব্যবহার করেছেন, তাঁদের সিদ্ধান্তও সমানভাবে দায়ী।

