ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইরানে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি সম্ভাব্য সামরিক অভিযান শেষ মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যায়। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম আই২৪ নিউজ দাবি করেছে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের কূটনৈতিক চাপের মুখে ওয়াশিংটন ওই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।
প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে বলা হয়, কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তত্ত্বাবধানে কুর্দি বাহিনীকে সম্ভাব্য অভিযানের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল। এই প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন কুর্দি গোষ্ঠীর সঙ্গে বৈঠক, অস্ত্র সরবরাহ এবং সামরিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিকল্পিত অভিযানের প্রায় এক সপ্তাহ আগে কুর্দি যোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে হামলা শুরুর প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত অভিযানে অনুমোদন দেয়নি।
প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে সম্ভাব্য অভিযানের তথ্য তুরস্কের কাছে পৌঁছে যায়। এরপর আঙ্কারা দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে পরিকল্পনাটি বন্ধ করতে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে নিজ দেশের পাশাপাশি ইরাক ও সিরিয়ায় কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কেন্দ্রীয় সরকার দুর্বল হয়ে পড়লে বা অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে তা তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এমন পরিস্থিতি এড়াতে আঙ্কারা সম্ভাব্য কুর্দি সামরিক তৎপরতা নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে ইরানে সম্ভাব্য কুর্দি অভিযানে সমর্থন না দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সময়ে সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার আগে কয়েক মাস ধরে ইরাক-ইরান সীমান্তে অবস্থানরত কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সামরিক সহায়তা দিয়েছিল মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ।
অন্যদিকে রয়টার্সও মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রায় এক বছর ধরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ইরান-ইরাক সীমান্তে অবস্থানরত কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর যোগাযোগ ছিল। আই২৪ নিউজের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইসরায়েল পশ্চিম ইরানের কয়েকটি এলাকায় বিমান হামলা চালিয়ে কুর্দি বাহিনীর প্রবেশের পথ তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই অভিযান বাস্তবায়িত হয়নি।
সম্ভাব্য ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলেও ইরান ও কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহে ইরানের পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের পিরানশাহর সীমান্ত এলাকায় ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তানের পাঁচ সদস্যকে হত্যা করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কুর্দি যোদ্ধারা সীমান্ত অতিক্রম করে ইরানে প্রবেশের চেষ্টা করলে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় ইসরায়েল ও তুরস্কের সম্পর্কেও উত্তেজনা বাড়ছে। সম্প্রতি তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সিএনএন তুর্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ইসরায়েল শুধু আমার সমস্যা নয়, এটি পুরো বিশ্বের সমস্যা।” অন্যদিকে ইসরায়েলের ডায়াসপোরা বিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি দেশটির গণমাধ্যম কান ১১-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ভবিষ্যতে তুরস্কের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এদিকে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজ জানিয়েছে, দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সরকারকে সতর্ক করেছে যে সিরিয়া, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে তুরস্কের প্রভাব দ্রুত বাড়ছে। তাদের দাবি, আঙ্কারা ধীরে ধীরে এমন একটি কৌশলগত অবস্থান তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এসব তথ্যের বেশিরভাগই ইসরায়েলি গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। এ বিষয়ে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একই ধরনের তথ্য নিশ্চিত করা হয়নি।

