রাশিয়ার ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইউক্রেনের শহর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করার পাশাপাশি ইউরোপের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতাও প্রকাশ করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের অনেক দেশ আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি ব্যয়বহুল অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে এসেছে। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় এসব অস্ত্রের মজুত কম, উৎপাদন ধীর এবং প্রতিটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের দাম অত্যন্ত বেশি।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ইউরোপের নয়টি দেশ ও ইউক্রেন মিলে নতুন একটি যৌথ উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। তাদের লক্ষ্য, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে ইউরোপের নিজস্ব সমন্বিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা।
সোমবার প্যারিসে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে আয়োজিত এক সম্মেলনের ফাঁকে এই উদ্যোগের ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত নেতারা জানান, তারা এমন একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে চান, যা সদস্যদেশগুলোর প্রযুক্তি, শিল্প সক্ষমতা, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং উৎপাদনব্যবস্থাকে একত্র করবে।
পরিকল্পনাটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এর পেছনের কারণ নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই। রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইউক্রেনের পাশাপাশি পুরো ইউরোপকেই বুঝিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতের বড় কোনো যুদ্ধে শুধু বর্তমান আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট হবে না।
কারা আছে নতুন জোটে
নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোটে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যোগ দিয়েছে মোট ১০টি দেশ।
দেশগুলো হলো—ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও ইউক্রেন।
এই তালিকায় ইউরোপের কয়েকটি বড় সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পসমৃদ্ধ দেশ রয়েছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, যুদ্ধবিমান ও সামরিক প্রযুক্তি তৈরির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ডেনমার্ক, স্পেন ও সুইডেনও ইউরোপের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তবে জোটের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সদস্য ইউক্রেন। কারণ ইউরোপের আর কোনো দেশ নিয়মিতভাবে এত বড় পরিসরে ব্যালিস্টিক ও উচ্চগতির ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলা করেনি।
ইউক্রেন গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়ার ইস্কান্দার, কিনঝাল এবং অন্যান্য উন্নত ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। কোন ধরনের রাডার কখন কার্যকর হয়, একটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করার পর কত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, একই সময়ে বহু হামলা হলে কোন লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হয়—এসব বিষয়ে ইউক্রেনের বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এই অভিজ্ঞতাই নতুন জোটের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।
বৃহত্তর জোটের ভেতরে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ
এই ঘোষণা আসে তথাকথিত ইচ্ছুক দেশগুলোর জোটের সম্মেলনের ফাঁকে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে ৩৫টি দেশ নিয়ে এই বৃহত্তর জোট ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা সমন্বয় করে আসছে।
ভবিষ্যতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে কোনো শান্তিচুক্তি হলে ইউক্রেনকে কী ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেওয়া হবে, তা নিয়েও এই দেশগুলো কাজ করছে।
প্যারিসের বৈঠকে প্রায় ২৫টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ইউক্রেনকে আরও অস্ত্র সরবরাহ, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার চাপ বাড়ানো এবং শীতের আগে ইউক্রেনের জ্বালানি খাতকে সহায়তার বিষয়েও আলোচনা হয়।
তবে ৩৫ দেশের বৃহত্তর জোটের সবাই নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা উদ্যোগে যোগ দেয়নি। মাত্র ১০টি দেশ প্রাথমিকভাবে এতে অংশ নিয়েছে।
এই সীমিত অংশগ্রহণ দেখিয়ে দেয়, ইউরোপের সব দেশ এখনো একই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় একমত নয়।
গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দেশ কেন নেই
নতুন জোটে কয়েকটি দেশের অনুপস্থিতি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড এবং বাল্টিক অঞ্চলের দেশ এস্তোনিয়া, লাতভিয়া ও লিথুয়ানিয়া রাশিয়ার সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থিত। সম্ভাব্য রুশ হামলার ঝুঁকিও এসব দেশের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি। তারপরও তারা প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের তালিকায় নেই।
যুক্তরাষ্ট্রও এই জোটে যোগ দেয়নি।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইউরোপের বর্তমান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ সক্ষমতার বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ইউক্রেন ও ইউরোপের আকাশ প্রতিরক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থাগুলোর একটি।
যুক্তরাষ্ট্রকে বাইরে রেখে নতুন উদ্যোগ শুরু করার অর্থ হচ্ছে, ইউরোপ দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভর করতে চাইছে।
তবে এর মানে এই নয় যে ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বন্ধ করে দিচ্ছে। বরং লক্ষ্য হচ্ছে, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সরবরাহক্ষমতা বা অস্ত্রের মজুতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।
ইউরোপের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র ঢাল কেন প্রয়োজন
রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসব অস্ত্র খুব দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে আসে এবং প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এগুলো ধ্বংস করা কঠিন।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অনেক উঁচুতে উঠে নির্দিষ্ট গতিপথ অনুসরণ করে দ্রুত নিচে নেমে আসে। ফলে সেটিকে শনাক্ত, অনুসরণ এবং আঘাত করার জন্য উন্নত রাডার, দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিশেষ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন।
ইউক্রেনের হাতে থাকা সব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এসব লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে না। মাত্র কয়েক ধরনের উন্নত ব্যবস্থা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে কার্যকর।
এর মধ্যে প্যাট্রিয়ট সবচেয়ে পরিচিত। কিন্তু প্রতিটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে চাহিদা বাড়ায় উৎপাদনও প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না।
একটি সস্তা আক্রমণকারী ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রলোভন সৃষ্টিকারী লক্ষ্য ধ্বংস করতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিরক্ষার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
রাশিয়া এই অর্থনৈতিক বৈষম্যকেও কাজে লাগাতে পারে। বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান একসঙ্গে পাঠিয়ে প্রতিপক্ষের মূল্যবান প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত শেষ করে দেওয়া সম্ভব।
নতুন ইউরোপীয় পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে এই ব্যয়ের ভারসাম্য বদলানো।
ঘোষণায় কী বলা হয়েছে
নতুন জোটের নেতারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি প্রতিরোধ ও পরাজিত করতে ইউরোপের একটি পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো প্রয়োজন।
তাদের পরিকল্পনায় যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়ন, সদস্যদেশগুলোর মধ্যে শিল্প সহযোগিতা, উন্মুক্ত প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব এবং বিশ্বস্ত উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
এর অর্থ, একটি দেশ একা পুরো ব্যবস্থা তৈরি করবে না। কোনো দেশ রাডার তৈরি করতে পারে, আরেকটি দেশ প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র, অন্য দেশ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বা উৎক্ষেপণযান তৈরি করতে পারে।
এরপর সব উপাদানকে একটি যৌথ পরিচালনাব্যবস্থার মধ্যে যুক্ত করা হবে।
এমন কাঠামো কার্যকর হলে একটি দেশে শনাক্ত হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের তথ্য দ্রুত অন্য দেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে প্রতিরোধের সময় বাড়বে এবং সীমান্তের বাইরে থেকেই হুমকি শনাক্ত করা যাবে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, ব্যালিস্টিক হুমকির মুখে তারা ইউক্রেনকে রক্ষা, সম্মিলিত নিরাপত্তা শক্তিশালী এবং ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আরও সরাসরি ইউরোপের দুর্বলতার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, অনেক সময় ইউক্রেনের কাছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র থাকে না। এই ঘাটতিই ইউক্রেনকে নতুন উদ্যোগে যোগ দিতে উৎসাহিত করেছে।
ইউরোপে কি আগে থেকেই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা নেই
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। তবে সেগুলো বিচ্ছিন্ন, ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রেই ইউরোপের বাইরের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ব্যবহার করে। এটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এর প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং পর্যাপ্ত গতিতে উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
ফ্রান্স ও ইতালি যৌথভাবে সাম্প/টি নামে একটি ইউরোপীয় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছে। এটি প্যাট্রিয়টের ইউরোপীয় বিকল্প হিসেবে দেখা হয়।
তবে সাম্প/টি ব্যবস্থার বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। ইউক্রেনে এর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও সংকটে পড়েছে।
অর্থাৎ ইউরোপের হাতে প্রযুক্তি আছে, কিন্তু তা পর্যাপ্ত সংখ্যায় নেই। বিভিন্ন দেশের ব্যবস্থাগুলোও সব সময় একই নেটওয়ার্কের মধ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করে না।
নতুন জোট এই বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাগুলোকে একটি বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করতে চায়।
ইউরোপীয় আকাশ ঢাল উদ্যোগের সঙ্গে পার্থক্য
২০২২ সাল থেকে জার্মানির নেতৃত্বে ইউরোপীয় আকাশ ঢাল উদ্যোগ চালু রয়েছে। এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হচ্ছে বিভিন্ন দেশকে একসঙ্গে বিদ্যমান আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার সুযোগ দেওয়া।
এই উদ্যোগের আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট এবং ইসরায়েলের অ্যারো-৩ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে ফ্রান্স শুরু থেকেই এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছে এবং এতে যোগ দেয়নি। প্যারিসের অভিযোগ ছিল, ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরোপের বাইরে তৈরি অস্ত্র কেনার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফ্রান্স চেয়েছে, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করুক।
নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা জোট এই বিতর্কের একটি নতুন সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটি বিদ্যমান ব্যবস্থা কেনার উদ্যোগ নয়; বরং নতুন প্রযুক্তি তৈরি, যৌথ উৎপাদন এবং ভবিষ্যতের নিজস্ব কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
তবে নতুন জোট বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোর বিকল্প হিসেবে কাজ করবে না। ইউরোপীয় আকাশ ঢাল উদ্যোগও বাতিল হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, দুটি পরিকল্পনা পাশাপাশি চলতে পারে। একটি বর্তমান ঘাটতি পূরণে দ্রুত বিদ্যমান অস্ত্র কিনবে, আর অন্যটি দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপের নিজস্ব সাশ্রয়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করবে।
ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের নতুন কাঠামো
ইউক্রেনের নিরাপত্তা ও সহযোগিতা কেন্দ্রের উপপ্রধান ওলেসিয়া হোরিয়ানভা নতুন উদ্যোগটিকে ইউরোপের ভবিষ্যৎ আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামোর সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তার মতে, এটি ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে তৈরি হচ্ছে না। এতে সদস্য নয় এমন দেশও যোগ দিতে পারে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তুলনামূলকভাবে বেশি নমনীয়তা থাকতে পারে।
ন্যাটোর মাধ্যমে বড় কোনো সামরিক প্রকল্প গ্রহণ করতে হলে অনেক দেশের অনুমোদন, নিয়ম এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রেও অর্থায়ন, শিল্পনীতি ও সদস্যদেশগুলোর স্বার্থ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে।
ছোট জোটের সুবিধা হলো, আগ্রহী দেশগুলো দ্রুত প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নিতে এবং নির্দিষ্ট প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে পারে।
তবে এই নমনীয়তার সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থাকলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, পরিচালনা ও সামরিক সমন্বয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
ইউক্রেন কেন কেন্দ্রীয় ভূমিকায়
এই প্রকল্পে ইউক্রেন শুধু সুরক্ষা গ্রহণকারী দেশ নয়; দেশটি প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা সরবরাহকারী অংশীদার হিসেবেও কাজ করবে।
ইউক্রেন বছরের পর বছর ধরে প্রায় প্রতিদিন রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান হামলার মুখে পড়েছে। কখনো একই রাতে বিপুলসংখ্যক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত এবং প্রতিরোধ করতে হয়েছে।
হোরিয়ানভার মতে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রেরও ইউক্রেনের মতো নিয়মিতভাবে অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বড় হামলা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা নেই।
ইউক্রেন জানে কোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রুশ ইস্কান্দারের বিরুদ্ধে কার্যকর, কোন পরিস্থিতিতে কিনঝাল ঠেকানো যায় এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র এলে কীভাবে প্রতিরোধ সাজাতে হয়।
এই বাস্তব জ্ঞান পরীক্ষাগারে অর্জন করা সম্ভব নয়।
ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর কাছে প্রতিটি সফল ও ব্যর্থ প্রতিরোধের তথ্য রয়েছে। এসব তথ্য নতুন রাডার, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
শুধু অভিজ্ঞতা নয়, শিল্প সক্ষমতাও দিচ্ছে ইউক্রেন
ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত সম্প্রসারণ করেছে। দেশটি বিভিন্ন ধরনের চালকবিহীন আকাশযান, ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরির চেষ্টা করছে।
জেলেনস্কি ইউক্রেনে তৈরি ফ্রেইয়া প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ভবিষ্যৎ ইউরোপীয় মডেল হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তার যুক্তি, ইউরোপ যদি সস্তা ও বিপুলসংখ্যায় উৎপাদনযোগ্য প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে চায়, তাহলে ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন উদ্ভাবন ও উৎপাদনব্যবস্থা কাজে লাগানো উচিত।
যুক্তরাষ্ট্র আলাদাভাবে ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের অনুমতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
এটি বাস্তবায়িত হলে ইউক্রেন শুধু অস্ত্র গ্রহণকারী দেশ থাকবে না; বরং ইউরোপীয় আকাশ প্রতিরক্ষা সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
ফ্রেইয়া কর্মসূচি কতটা গুরুত্বপূর্ণ
ফ্রেইয়া ইউক্রেনের নিজস্ব প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির একটি কর্মসূচি। এর লক্ষ্য হচ্ছে এমন অস্ত্র তৈরি করা, যা প্যাট্রিয়টের তুলনায় অনেক কম খরচে উৎপাদন করা যাবে।
এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফায়ার পয়েন্টের দাবি, ইউক্রেনে তৈরি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের দাম একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের দামের তুলনায় অনেক কম হতে পারে।
এই ব্যয়ের পার্থক্য নতুন জোটের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়া যদি তুলনামূলকভাবে কম খরচে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারে, তাহলে ইউরোপেরও এমন প্রতিরোধব্যবস্থা দরকার যা বিপুল সংখ্যায় তৈরি করা সম্ভব।
একটি হামলাকারী ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে যদি প্রতিবার কয়েক মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়, তাহলে দীর্ঘ যুদ্ধের সময় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই থাকবে না।
ফ্রেইয়া সফল হলে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন সংখ্যা বাড়ানো এবং প্রতিটি হামলার বিপরীতে ব্যয় কমানো সম্ভব হতে পারে।
তবে এখনো বড় একটি অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফ্রেইয়া যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করেনি।
পরীক্ষাগারে সফল হওয়া এবং বাস্তব যুদ্ধে দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা এক বিষয় নয়। ব্যবস্থাটিকে বাস্তব হামলার মুখে নির্ভুলতা, গতি, নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তা প্রমাণ করতে হবে।
এক বছরের মধ্যে ব্যবস্থা তৈরি সম্ভব কি
জোটের ঘোষণায় একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরির কথা বলা হলেও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেওয়া হয়নি।
১০টি দেশ প্রথমে অভিন্ন সামরিক চাহিদা নির্ধারণ করবে। এরপর যৌথ প্রযুক্তিগত কর্মদল গঠন এবং প্রাথমিক কার্যকর সক্ষমতা অর্জনের জন্য একটি পথনকশা তৈরি করা হবে।
জেলেনস্কি অবশ্য অনেক বেশি আশাবাদী সময়সীমা দিয়েছেন। প্যারিসে তিনি নেতাদের বলেছেন, ইউক্রেন ও তার অংশীদারেরা আগামী ১২ মাসের মধ্যে ফ্রেইয়া কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কম খরচে বিপুলসংখ্যায় উৎপাদনযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।
তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন।
তবে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শুধু ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তৈরি হয় না। এর সঙ্গে প্রয়োজন দূরপাল্লার রাডার, উপগ্রহের তথ্য, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, তথ্য আদান-প্রদানের নিরাপদ ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত সেনা, উৎক্ষেপণযান ও রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো।
এসব উপাদান একসঙ্গে কাজ না করলে শুধু প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেই কার্যকর সুরক্ষা তৈরি হবে না।
তাই ১২ মাসে পরীক্ষামূলক বা সীমিত সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হলেও পুরো ইউরোপকে রক্ষা করার মতো ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
ইউরোপের প্রশাসনিক ধীরগতি বড় বাধা
হোরিয়ানভা মনে করেন, নতুন ব্যবস্থা কত দ্রুত মোতায়েন করা যাবে, তা মূলত ইউরোপীয় দেশগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।
ইউরোপে যৌথ প্রতিরক্ষা প্রকল্পের ক্ষেত্রে সাধারণত কয়েকটি সমস্যা দেখা যায়।
প্রথমত, কোন দেশ কত অর্থ দেবে, তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। দ্বিতীয়ত, কোন দেশের প্রতিষ্ঠান কতটুকু উৎপাদনের কাজ পাবে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা থাকে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ভাগাভাগি ও মেধাস্বত্ব নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া প্রতিটি দেশ নিজস্ব সামরিক চাহিদা ও শিল্পস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে চায়। ফলে যৌথ প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নিতে অনেক সময় লেগে যায়।
ইউক্রেনের জন্য অপেক্ষার সুযোগ কম। দেশটি এখনই রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে রয়েছে। কিন্তু ইউরোপের অনেক দেশের কাছে এটি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রকল্প।
এই ভিন্ন জরুরিতা জোটের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণে চাপ তৈরি করতে পারে।
বড় প্রতিরক্ষা প্রকল্পে সময় লাগে
সংশয়বাদীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অর্থায়ন নিশ্চিত হলেও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা স্থাপন করতে কয়েক বছর সময় লাগে।
জার্মানি ২০২৩ সালে ইসরায়েলের অ্যারো-৩ ব্যবস্থা কেনার আদেশ দিয়েছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশটি প্রথম প্রতিরক্ষা ইউনিট সক্রিয় করে। তারপরও পুরো ব্যবস্থা ২০৩০ সালের আগে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে না।
এই উদাহরণ দেখায়, তৈরি ও পরীক্ষিত ব্যবস্থা কিনলেও প্রশিক্ষণ, স্থাপনা, রাডার সংযোগ, সামরিক সমন্বয় এবং পরিচালনাগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লাগে।
নতুন জোটের ক্ষেত্রে কাজ আরও কঠিন হতে পারে। কারণ এখানে শুধু অস্ত্র কেনা নয়, নতুন ব্যবস্থা তৈরি করার কথা বলা হচ্ছে।
তবে যুদ্ধকালীন জরুরি পরিস্থিতি উন্নয়নপ্রক্রিয়া দ্রুতও করতে পারে। ইউক্রেন ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, প্রয়োজনের চাপে কয়েক মাসের মধ্যে নতুন ধরনের অস্ত্র তৈরি ও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
পরিকল্পনাটির অর্থনৈতিক যুক্তি
নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ঢালের সামরিক গুরুত্বের পাশাপাশি বড় একটি অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে।
ইউরোপ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল থেকে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনছে। এতে ইউরোপের অর্থ বিদেশি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের সরবরাহ বিদেশি সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি হলে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে। নতুন কারখানা, গবেষণাকেন্দ্র ও সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হতে পারে।
একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ভাগ করে দেওয়া হলে কোনো একটি কারখানা বা দেশের ওপর নির্ভরতা কমবে।
তবে যৌথ উৎপাদন সফল করতে হলে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার পরিবর্তে দায়িত্ব ভাগাভাগি প্রয়োজন। কোন দেশ রাডার বানাবে, কে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করবে এবং কে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পরিচালনা করবে—এসব বিষয়ে শুরুতেই স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কি সত্যিই কমবে
নতুন জোটের বড় রাজনৈতিক লক্ষ্যগুলোর একটি হলো ইউরোপের কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানো।
যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হলেও ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকার সব সময় ইউরোপের প্রয়োজনের সঙ্গে মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। যুক্তরাষ্ট্রকে একই সময়ে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়েও কাজ করতে হয়।
বিশ্বজুড়ে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার চাহিদা বাড়লে ইউরোপ প্রয়োজনের সময় পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র নাও পেতে পারে।
আর কোনো মার্কিন সরকার ইউরোপের নিরাপত্তায় আগের তুলনায় কম ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিলে মহাদেশটির দুর্বলতা আরও বেড়ে যাবে।
নিজস্ব ব্যবস্থা থাকলে ইউরোপ অন্তত প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন, মজুত ও ব্যবহার নিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
তবে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন সহজ নয়। ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এখনো মার্কিন প্রযুক্তি, উপগ্রহ ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভরশীল।
তাই নতুন পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নয়; বরং নির্ভরতার ভারসাম্য পরিবর্তনের চেষ্টা।
পরিকল্পনার প্রধান চ্যালেঞ্জ
নতুন জোটের সামনে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে।
প্রথম বাধা অর্থায়ন। উন্নত রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র, উৎক্ষেপণযান ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা তৈরি করতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হবে।
দ্বিতীয় বাধা প্রযুক্তি। উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার প্রযুক্তি বিশ্বের খুব অল্পসংখ্যক দেশের হাতে রয়েছে।
তৃতীয় বাধা সময়। ইউক্রেনের এখনই প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন, কিন্তু নতুন ইউরোপীয় ব্যবস্থা তৈরি হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
চতুর্থ বাধা রাজনৈতিক ঐক্য। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যেও হুমকির ধারণা, সামরিক ব্যয় এবং শিল্পস্বার্থ নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে।
পঞ্চম বাধা উৎপাদনক্ষমতা। সফল নকশা তৈরি হলেও বছরে পর্যাপ্তসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা না গেলে রাশিয়ার বড় হামলা ঠেকানো কঠিন হবে।
পরিকল্পনার বড় শক্তি কোথায়
সব বাধা সত্ত্বেও এই উদ্যোগের কয়েকটি বড় সুবিধা রয়েছে।
প্রথমত, ইউরোপের শিল্প ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনেক বড়। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে দেশগুলো দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনের বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নতুন ব্যবস্থাকে বাস্তবসম্মত করতে সাহায্য করবে।
তৃতীয়ত, একাধিক দেশের উৎপাদনব্যবস্থা যুক্ত থাকলে সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হলেও পুরো প্রকল্প থেমে যাবে না।
চতুর্থত, সস্তা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা গেলে রাশিয়ার বিপুলসংখ্যক হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষের মজুত শেষ করার কৌশল দুর্বল হয়ে পড়বে।
পঞ্চমত, এই প্রকল্প ভবিষ্যতে ইউরোপের সামগ্রিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
এটি কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন প্রতিযোগিতা
জোটের নেতারা পরিকল্পনাটিকে সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক বলে দাবি করেছেন। ব্যবস্থাটি কোনো দেশে আক্রমণ করার জন্য নয়; বরং আকাশে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য তৈরি হবে।
তারপরও রাশিয়া এটিকে নিজের কৌশলগত সক্ষমতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে দেখতে পারে।
মস্কো নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি, হামলার সংখ্যা বাড়ানো বা প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে।
ফলে একটি নতুন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক পক্ষ উন্নত প্রতিরক্ষা তৈরি করলে অন্য পক্ষ আরও দ্রুত, নিচু পথে চলা বা গতিপথ পরিবর্তনে সক্ষম অস্ত্র তৈরি করতে পারে।
তাই কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ঢাল শতভাগ নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
এর মূল উদ্দেশ্য হবে হামলার সফলতার হার কমানো, শত্রুর ব্যয় বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর ও স্থাপনাকে সুরক্ষিত রাখা।
ইউক্রেনের তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান হবে কি
নতুন জোট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলেও ইউক্রেনের সংকট তাৎক্ষণিক।
কিয়েভের প্রয়োজন এখনই প্যাট্রিয়ট ও সাম্প/টি ক্ষেপণাস্ত্র, অতিরিক্ত রাডার এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার খুচরা যন্ত্রাংশ।
নতুন ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার অপেক্ষায় থাকলে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সামরিক স্থাপনা ও শহরে হামলা চালিয়ে যেতে পারবে।
তাই নতুন প্রকল্পের পাশাপাশি সদস্যদেশগুলোকে বর্তমান অস্ত্র সরবরাহও চালু রাখতে হবে।
এই দ্বৈত দায়িত্বই সবচেয়ে কঠিন। একদিকে চলমান যুদ্ধের জন্য ব্যয়বহুল অস্ত্র দিতে হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের সস্তা ব্যবস্থা তৈরিতে অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তবসম্মত এই উদ্যোগ
ইউরোপের নিজস্ব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা গড়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেখায়, রাশিয়ার যুদ্ধের পর ইউরোপ শুধু অস্ত্র কেনার বদলে নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও প্রযুক্তি নিয়ে নতুন করে ভাবছে।
তবে ঘোষণা ও বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
যৌথ চাহিদা নির্ধারণ, প্রযুক্তি নির্বাচন, অর্থায়ন, উৎপাদন এবং পরীক্ষার প্রতিটি ধাপেই জটিলতা থাকবে। ১২ মাসের মধ্যে সীমিত বা পরীক্ষামূলক সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব হলেও মহাদেশজুড়ে কার্যকর ঢাল গড়ে তুলতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
জোটটির সফলতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর।
প্রথমত, দেশগুলো কত দ্রুত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইউক্রেনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে তারা কতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রযুক্তিতে রূপান্তর করতে পারে। তৃতীয়ত, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ও উৎপাদন সময় কতটা কমানো যায়।
এই পরিকল্পনা সফল হলে ইউরোপ শুধু ইউক্রেনকে রক্ষা করার নতুন উপায় পাবে না; একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নিজের নির্ভরতাও কমাতে পারবে।
ব্যর্থ হলে এটি ইউরোপের আরও একটি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘসূত্রতার শিকার প্রতিরক্ষা প্রকল্পে পরিণত হবে।
রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইতোমধ্যে ইউরোপকে একটি কঠিন সত্য বুঝিয়েছে—আকাশ প্রতিরক্ষা ছাড়া আধুনিক যুদ্ধের সময় কোনো শহর, বিদ্যুৎব্যবস্থা বা সামরিক ঘাঁটি নিরাপদ নয়। এখন প্রশ্ন হলো, ইউরোপ এই শিক্ষা থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে, নাকি সিদ্ধান্তহীনতায় আরও মূল্যবান সময় হারাবে।

