মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ নিয়ে গোপনীয়তা রক্ষার ঘটনাকে সরকারি ধোঁকার একটি চমকপ্রদ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে থাকা গোপনীয়তার মাত্রার তুলনায় সেটি নিতান্তই সামান্য বলে মনে করেন রুশ অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা। সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
পুতিনের কর্মকাণ্ড এতটাই রহস্যে ঘেরা যে সাংবাদিকেরা কখনো কখনো তার কার্যালয়ের গাছের পাতার অবস্থার মতো অতি সামান্য বিষয় পর্যবেক্ষণ করেও তার অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
চলতি বছরে রুশ রাষ্ট্রপ্রধানের প্রচার করা বৈঠকগুলো ক্রেমলিনের দাবি করা সময়ে সত্যিই অনুষ্ঠিত হয়েছিল কি না, তা যাচাই করতে কয়েকজন সাংবাদিক এমন পদ্ধতি অনুসরণ করেন। পুতিনের কক্ষের টবের গাছের পাতা শুকিয়ে যাওয়া এবং পরে আবার সতেজ হয়ে ওঠার দৃশ্য বিশ্লেষণ করে তারা বুঝতে পারেন, প্রচারিত বৈঠকগুলো আসলে ভিন্ন সময়ে এবং অন্য কোনো দিনে ধারণ করা হয়েছিল।
প্রেসিডেন্ট পুতিনকে ঘিরে এ ধরনের ছলচাতুরি ও গোপনীয়তা রাশিয়ায় অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। এর বিপরীতে গত মাসে তুরস্কের একটি রানওয়েতে ট্রাম্পের গোপনে বিমান বদলের বিষয়টি গোপন রাখার কারণে হোয়াইট হাউস তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে চলতি সপ্তাহে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ বিষয়টি প্রকাশ করার পর সমালোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
রুশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক মিখাইল রুবিন বলেন, রাশিয়ার অভিজ্ঞতার তুলনায় এসব ঘটনা ‘শিশুদের খেলা’র মতো।
মিখাইল রুবিন ও অন্যান্য সাংবাদিকের অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট পুতিন তার প্রতিটি বাসভবনে প্রায় একই রকম অফিসকক্ষ তৈরি করে রেখেছেন। এর ফলে ভিডিও দেখে তিনি আসলে কোন বাসভবনে অবস্থান করছেন, তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন ও উপগ্রহচিত্র অনুযায়ী, তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুতিনের জন্য একটি বিশেষ প্রেসিডেন্সিয়াল ট্রেনও তৈরি করেছে। পাশাপাশি তার অন্তত তিনটি গ্রামীণ বাসভবনের কাছাকাছি গোপন রেললাইন ও গোপন স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে।
এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদেরও এই ব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়। পুতিনের সঙ্গে তাদের বৈঠক টেলিভিশনে সম্প্রচার না হওয়া পর্যন্ত, কখনো কখনো এক সপ্তাহ পরেও, তারা বৈঠকটির বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখেন। পরে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয় যেন বৈঠকটি সেদিনই অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নির্বাসনে থেকে ক্রেমলিনের ওপর নজর রাখা রুশ সাংবাদিক ফারিদা রুস্তামোভা বলেন, রাশিয়ায় প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি বা অবস্থান নিয়ে সরকারি মিথ্যাচার ‘অতি সাধারণ বিষয়’। তিনি এমন প্রতিবেদনও তুলে ধরেছেন, যেখানে পুতিনের টেলিভিশনে প্রচারিত বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কখনো কখনো বহু পুরোনো ঘটনার কথা বলতে দেখা গেছে। অন্তত একটি ঘটনায় দেখা গেছে, পুতিনের পোশাক ও চুলের কাটিং তার অন্য প্রকাশ্য উপস্থিতির সঙ্গে একেবারেই মিলছিল না।
রুশ সাংবাদিকদের মধ্যে এ ধরনের দেরিতে প্রচারিত পুতিনের ভিডিও বৈঠকের একটি বিশেষ পরিভাষাও রয়েছে—‘কনসার্ভি’। শব্দটির বাংলা অর্থ ‘টিনজাত’ বা ‘কৌটাবন্দী খাবার’।
ক্রেমলিন অবশ্য অতীতেও পুতিনের অবস্থান সম্পর্কে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধেরও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর মস্কো প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সময় ২০২১ সালে লেক ভালদাইয়ে পুতিনের বাসভবন পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অ্যান্টন ত্রোয়ানোভস্কি বলেন, তখনই তিনি বুঝতে পারেন প্রেসিডেন্ট নিজের চলাচল গোপন রাখতে কতটা চরম ব্যবস্থা নেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে পুতিনের কমপাউন্ডের দিকে নির্মিত একটি নতুন ও রহস্যময় রেললাইনের কথা জানিয়েছিলেন। পরে উপগ্রহচিত্রে হেলিপ্যাডসহ একটি নতুন রেলস্টেশন দেখা যায়। অথচ ওই স্টেশনের কোনো উল্লেখ সময়সূচি বা ট্রেনের মানচিত্রে ছিল না।
২০২৩ সালে রাশিয়ার নিরাপত্তা সংস্থা এফএসও থেকে পালিয়ে আসা এক সাবেক কর্মকর্তা দাবি করেন, নজরদারি বা অবস্থান শনাক্ত করা এড়াতেই মূলত পুতিন বিমানের বদলে ট্রেনে যাতায়াত করেন।
ফাঁস হওয়া নথি থেকে জানা যায়, সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো দেখতে হলেও একটি বিশেষ ও গোপন সাঁজোয়া ট্রেন পুতিনের প্রেসিডেন্সিয়াল অফিসের ব্যবহারের জন্য সাজানো হয়েছিল। ট্রেনটিতে জিম, স্পা এবং বিশেষ যোগাযোগের সরঞ্জাম ছিল। এটি পুতিন নিজেই ব্যবহার করতেন।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় পুতিনের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর হয়েছিল বলে মনে করা হয়। সে সময় তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা কর্মকর্তাদের দুই সপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে থাকতে বাধ্য করা হতো। একই সঙ্গে পুতিনের বিচ্ছিন্ন থাকার এই ব্যবস্থা তার অবস্থান গোপন রাখা আরও সহজ করে তুলেছিল।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর এই গোপনীয়তা আরও উচ্চমাত্রায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে ইউক্রেনীয় ড্রোন রাশিয়ার অভ্যন্তরে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এসব হামলা মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে এবং সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী পুতিনের যাতায়াত ও ভ্রমণ আরও সীমিত হয়ে পড়ে।
সাংবাদিক ফারিদা রুস্তামোভা জানান, মস্কোতে এখন এমন গুঞ্জন রয়েছে যে শহরের রাস্তায় সাইরেন বাজিয়ে যানজটের মধ্য দিয়ে ছুটে চলা বিশাল যে গাড়িবহরকে পুতিনের বহনকারী বলে মনে করা হয়, সেগুলোর কিছু আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার কৌশল হতে পারে। মস্কোতে ক্রেমলিনের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে এমন অ্যান্টনের এক পরিচিত ব্যক্তিও তাকে একই কথা জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক মিখাইল রুবিন ২০২০ সালে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করেন যে পুতিন মস্কোর উপশহর এবং কৃষ্ণসাগর তীরের পর্যটন শহর সোচিতে থাকা তার দুটি আলাদা বাসভবনে হুবহু একই ধরনের দুটি অফিস থেকে কাজ করতেন। এর ফলে ক্রেমলিনের পক্ষে তার অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া সহজ হতো।
গত বছর ‘রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টি’র একটি প্রতিবেদনে এই কৌশলের আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে একই রকম দেখতে দুটি অফিসের দরজার হাতল ও দেয়ালের সংযোগস্থলের মতো অত্যন্ত ছোট পার্থক্য তুলে ধরা হয়। এসব সূক্ষ্ম পার্থক্যই প্রমাণ করে, অফিস দুটি আসলে ভিন্ন স্থানে অবস্থিত।
মিখাইল রুবিন বর্তমানে উত্তর ক্যারোলিনায় থাকেন এবং অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘প্রোয়েক্ট’-এর উপসম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন। প্রায় এক দশক আগে রাশিয়ার একটি ব্যবসাবিষয়ক পত্রিকায় ক্রেমলিনের খবর সংগ্রহের সময়ই তিনি প্রথম পুতিনের এই চরম গোপনীয়তার বিষয়টি আঁচ করতে শুরু করেন।
একবার তিনি দুর্ঘটনাক্রমে পুতিনের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের একটি বৈঠকের জন্য হাজির হতে দেখেছিলেন। অথচ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে বৈঠকটির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল কয়েক দিন পর। রুবিন বলেন, তখনই তিনি বুঝতে পারেন, ‘পুতিনের জনসমক্ষে থাকা ইমেজ বা ভাবমূর্তি পুরোপুরি সাজানো। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ মিথ্যাচার।’
পুতিনকে ঘিরে এই চাতুরি বা প্রতারণার উদ্দেশ্য কেবল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়। এর মাধ্যমে তিনি সব সময় ব্যস্ত এবং পরিস্থিতি তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—জনসমক্ষে এমন একটি ধারণা তৈরি করতেও চান বলে মনে করেন অনুসন্ধানী সাংবাদিকেরা।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ঘিরে দেশটির সংবাদমাধ্যমের যে ব্যাপক নজরদারি ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির তীব্রতা রয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনাভাইরাস মহামারির আগের রাশিয়ায় এমন পরিস্থিতি কল্পনা করাও কঠিন ছিল।
তবে গণমাধ্যমের ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন বিধিনিষেধ এবং গত মাসে প্রেসিডেন্টের বিমানসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি রাশিয়ার অনেকের কাছেই পরিচিত দৃশ্যের মতো মনে হচ্ছে।
মিখাইল রুবিন বলেন, এই দিক থেকে পুতিন এমন এক চরম উদাহরণ, যিনি তার চারপাশের সবকিছুকে হাস্যকর বা অস্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। তার মতে, ট্রাম্প এখন কেবল সেই একই পথে এগোতে শুরু করেছেন।

