পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তান আবারও বড় ধরনের সহিংসতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর ওপর একের পর এক হামলা, নিরাপত্তা সদস্যদের অপহরণ ও হত্যা এবং পাল্টা সামরিক অভিযানে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
একই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে আরও নাটকীয় একটি দাবি—বেলুচিস্তান নাকি পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, প্রদেশটির অধিকাংশ এলাকা নাকি এখন স্বাধীনতাকামীদের নিয়ন্ত্রণে।
এসব দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল কতটা? বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ কি সত্যিই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে? পাকিস্তান কি ভেঙে যাওয়ার পথে?
ডন, জিও নিউজ, আল জাজিরা, রয়টার্স ও এপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেলুচিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে গুরুতর। কয়েক দশকের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত এখন আরও সংগঠিত, প্রাণঘাতী ও বিস্তৃত রূপ নিয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে কার্যকরভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কিংবা বিএলএ প্রদেশটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ নেই।
বরং বেলুচিস্তানের ‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার বড় অংশের উৎস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু বিবৃতি, পোস্ট ও অযাচাইকৃত দাবি।
এগুলোর সঙ্গে বিএলএর সশস্ত্র তৎপরতা এবং দীর্ঘদিনের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকে মিলিয়ে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, পাকিস্তানের ভাঙন বুঝি আসন্ন। বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

কেন আলোচনায় বেলুচিস্তান?
চলতি জুলাইয়ে বেলুচিস্তানে কয়েকটি বড় হামলার পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ভাষ্য, ৬ জুলাই থেকে কয়েক দিনের মধ্যে তিনটি বড় হামলায় অন্তত ৪২ জন পুলিশ ও সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
এরমধ্যে জিয়ারাত অঞ্চলের মাঙ্গি বাঁধের কাছে একটি পুলিশ পোস্টে হামলা চালিয়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে অপহরণ করা হয়। পরে অপহৃত ১৮ পুলিশ সদস্যের মরদেহ পাওয়া যায়। পৃথক আরেক হামলায় নিহত হন ১১ সেনাসদস্য।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী এরপর বেলুচিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের অভিযান শুরু করে। সেনাবাহিনী, ফ্রন্টিয়ার কোর ও পুলিশ যৌথভাবে এসব অভিযানে অংশ নেয়।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, কয়েক দিনের অভিযানে বহু সশস্ত্র যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তবে সংঘাতপূর্ণ ও দুর্গম এলাকায় স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের প্রবেশ সীমিত হওয়ায় উভয় পক্ষের হতাহতের দাবি আলাদাভাবে যাচাই করা কঠিন।
পাকিস্তানের সামরিক মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমদ শরিফ চৌধুরী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উদ্দেশে কঠোর ভাষায় বলেছেন, ‘আমরা তোমাদের ধাওয়া করব, আমরা তোমাদের আঘাত করব।’
তার বক্তব্যে স্পষ্ট, ইসলামাবাদ বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে।
তবে এবারের সহিংসতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে বিএলএ ও অন্য বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো হামলার পরিধি বাড়িয়েছে। তারা সামরিক ঘাঁটি, পুলিশ স্টেশন, মহাসড়ক, রেলপথ, সরকারি স্থাপনা এবং চীনা স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
বড় শহরের বাইরে প্রত্যন্ত এলাকায় সাময়িকভাবে সড়ক অবরোধ, তল্লাশিচৌকি স্থাপন কিংবা ছোট শহরে প্রবেশ করে হামলা চালানোর ঘটনাও ঘটেছে।
বিএলএ কি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে?
পাকিস্তানের বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিএলএ সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানকে একটি কার্যকর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেছে বা নতুন সরকার গঠন করেছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি কথিত বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, বেলুচিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং প্রদেশটির প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকা স্বাধীনতাকামীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু ওই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে, প্রাদেশিক সরকার বিলুপ্ত হয়েছে কিংবা বিএলএ স্থায়ীভাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
এখানে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে বোঝা জরুরি।
প্রথমত, বিএলএ বহু বছর ধরেই স্বাধীন বেলুচিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ঘোষণা করে আসছে। পাকিস্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া তাদের নতুন কোনো দাবি নয়। সংগঠনটির বিবৃতি, প্রচারণামূলক ভিডিও ও সামরিক অভিযানের ভাষায় প্রায়ই ‘স্বাধীনতা’, ‘মুক্তি’ এবং ‘দখলদার বাহিনী’—এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করা হয়।
দ্বিতীয়ত, কোনো স্বাধীনতাকামী নেতা বা প্রবাসী বেলুচ কর্মীর স্বাধীনতার আহ্বান আর একটি ভূখণ্ডের কার্যকর স্বাধীনতা এক বিষয় নয়। ২০২৫ সালেও কয়েকজন বেলুচ জাতীয়তাবাদী নেতা ও কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এসব বক্তব্য কোনো স্বীকৃত অন্তর্বর্তী সরকার, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে রূপ নেয়নি।
তৃতীয়ত, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের জন্য একটি শহর, মহাসড়ক বা সরকারি স্থাপনায় প্রবেশ করলে সেটিকে স্থায়ী ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ বলা যায় না। বিএলএ অতীতে কিছু এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীকে পিছু হটিয়ে সাময়িক অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী পরে সেখানে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
অর্থাৎ, বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি বাস্তব রাজনৈতিক আন্দোলন এবং বিএলএর ঘোষিত লক্ষ্য হলেও ‘বেলুচিস্তান ইতোমধ্যে স্বাধীন হয়ে গেছে’—এ বক্তব্য এখন পর্যন্ত তথ্যসমর্থিত নয়।

বিএলএ আসলে কী চায়?
বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ একটি সশস্ত্র বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
বিএলএর দাবি, ১৯৪৮ সালে বেলুচিস্তানের তৎকালীন কালাত রাষ্ট্রকে জোর করে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের একটি অংশ ওই ঘটনাকে ‘দখল’ হিসেবে দেখে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সরকারি ভাষ্য, পাকিস্তানে কালাতের অন্তর্ভুক্তি আইনগত ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হয়েছিল।
এই ঐতিহাসিক বিরোধই বেলুচ জাতীয়তাবাদের অন্যতম ভিত্তি। পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বেলুচিস্তানে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ছিল। ১৯৪৮ সালের পর বিভিন্ন সময়ে অন্তত পাঁচ দফা বড় ধরনের বিদ্রোহ বা সশস্ত্র সংঘাত হয়েছে।
তবে বর্তমান আন্দোলন কেবল ইতিহাসের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকানা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামরিক উপস্থিতি, নিখোঁজ ব্যক্তি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ।
বেলুচিস্তানে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, তামা ও সোনার মজুত রয়েছে। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর গদরও এই প্রদেশে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপেকের অন্যতম কেন্দ্র গদর বন্দর।
বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের অভিযোগ, তাদের ভূখণ্ডের সম্পদ ব্যবহার করে পাকিস্তানের অন্য অঞ্চল উন্নত হয়েছে, কিন্তু স্থানীয় জনগণ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, বিশুদ্ধ পানি ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
অনেকের অভিযোগ, বড় উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত এবং প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তার নামে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে।
পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগের জবাবে বলছে, বেলুচিস্তানে উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক, বন্দর, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে। সরকারের দাবি, বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে এবং বিদেশি শক্তির সহায়তায় সহিংসতা চালাচ্ছে।

কেন সংঘাত আরও ভয়াবহ হচ্ছে?
বেলুচিস্তানের বর্তমান বিদ্রোহ আগের অনেক পর্যায়ের তুলনায় ভিন্ন। একসময় আন্দোলনটি মূলত কয়েকজন প্রভাবশালী উপজাতীয় নেতা ও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সীমিত ছিল। এখন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত তরুণ, শহুরে জনগোষ্ঠী এবং কিছু নারীও আন্দোলনের বিভিন্ন ধারায় যুক্ত হয়েছেন।
বিএলএও তার যুদ্ধকৌশল বদলেছে। সংগঠনটি এখন শুধু পাহাড়ি এলাকায় গেরিলা হামলা চালায় না, আত্মঘাতী হামলা, সমন্বিত বহুমুখী অভিযান, মহাসড়ক অবরোধ এবং বড় নিরাপত্তা স্থাপনায় আক্রমণ করছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিএলএ ‘অপারেশন হেরোফ ২.০’ নামে বেলুচিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় সমন্বিত হামলা চালানোর দাবি করে।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলায় পুলিশ স্টেশন, নিরাপত্তা স্থাপনা, সরকারি ভবন ও জনবহুল এলাকা লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। পাল্টা অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনী বহু যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করে।
এ ধরনের হামলায় নারী যোদ্ধাদের অংশগ্রহণও আলোচনায় এসেছে। বিএলএর ‘মাজিদ ব্রিগেড’ নামে পরিচিত আত্মঘাতী ইউনিটে নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ সংগঠনটির প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সামরিক শক্তি দিয়ে সাময়িকভাবে হামলা কমানো সম্ভব হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষোভের সমাধান না হলে সংঘাতের মূল কারণ দূর হবে না।
এক বিশ্লেষকের ভাষায়, ‘শুধু সেনাবাহিনী দিয়ে ক্ষোভ নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব নয়।’

রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিযোগ
বেলুচিস্তান সংকটের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজের অভিযোগ।
বেলুচ মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, গত দুই দশকে বহু ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও সন্দেহভাজন বিচ্ছিন্নতাবাদীকে নিরাপত্তা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে। অনেকের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। আবার কারও মরদেহ পরে প্রত্যন্ত এলাকায় পাওয়া গেছে।
পাকিস্তান সরকার সব অভিযোগ স্বীকার করে না। সরকারের বক্তব্য, নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত অনেক ব্যক্তি সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছেন, বিদেশে চলে গেছেন অথবা সংঘাতে নিহত হয়েছেন।
তবে মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, বহু ক্ষেত্রে পরিবারগুলো বছরের পর বছর কোনো তথ্য পায় না এবং কার্যকর তদন্তও হয় না।
এই ইস্যুতে বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি বা বিওয়াইসি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তুলেছে। সংগঠনটির নেতা মাহরাং বেলুচ আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
তবে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ বিওয়াইসির বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া ও বিএলএর সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ করেছে। সংগঠনটি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে শান্তিপূর্ণ মানবাধিকার আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এই পরিস্থিতি বেলুচিস্তানের সংকটকে আরও জটিল করেছে। কারণ, সেখানে একদিকে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন রয়েছে, অন্যদিকে গুম, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে অহিংস আন্দোলনও চলছে।
পাকিস্তান অনেক সময় উভয় ধারাকে একই নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে দেখছে বলে সমালোচনা রয়েছে।

চীন কেন এই সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ
বেলুচিস্তানের সংঘাতে চীনের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের কেন্দ্রবিন্দু গদর বন্দর। সিপেকের আওতায় বন্দর, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন।
বিএলএর অভিযোগ, এসব প্রকল্প বেলুচ জনগণের সম্পদ ‘লুট’ করার প্রক্রিয়ার অংশ। এ কারণে সংগঠনটি একাধিকবার চীনা নাগরিক, প্রকৌশলী ও প্রকল্পে হামলা চালিয়েছে।
পাকিস্তান সরকার অবশ্য বলছে, সিপেক বেলুচিস্তানের উন্নয়নের বড় সুযোগ। তাদের দাবি, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিদেশি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে স্থানীয় জনগণেরই ক্ষতি করছে।
চীনা নাগরিকদের ওপর হামলা পাকিস্তানের জন্য বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। ইসলামাবাদকে এখন হাজার হাজার চীনা কর্মীর নিরাপত্তায় অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করতে হচ্ছে।

পাকিস্তান কি সত্যিই ভেঙে যাচ্ছে?
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে পাকিস্তান এখনই ভেঙে যাচ্ছে—এ কথা বলার সুযোগ নেই।
বেলুচিস্তানের ভূখণ্ড বিশাল। এটি পাকিস্তানের মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ। কিন্তু সেখানে দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ মানুষ বাস করে। ভূখণ্ডের দিক থেকে প্রদেশটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনসংখ্যা কম এবং বসতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এখনও প্রদেশটির বড় শহর, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সীমান্ত, বিমানবন্দর, বন্দর ও প্রধান অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। কোয়েটায় প্রাদেশিক সরকার কার্যকর রয়েছে। পাকিস্তানের প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও নিরাপত্তা কাঠামোও সেখানে কাজ করছে।
বিএলএ বড় হামলা চালাতে এবং কিছু এলাকায় সাময়িকভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত করতে সক্ষম হলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে বড় কোনো শহর বা বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড শাসন করছে না। সংগঠনটির নিজস্ব স্বীকৃত সরকার, নিয়মিত প্রশাসন বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও নেই।
তবে এর অর্থ এই নয় যে পাকিস্তানের জন্য উদ্বেগের কিছু নেই।
বিএলএর হামলার পরিধি ও সক্ষমতা বাড়ছে। তারা একই সময়ে একাধিক স্থানে হামলা চালাতে পারছে, নিরাপত্তা বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করছে এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা অভিযানে হতাহতের সংখ্যা দেখায়, সংঘাতটি আর সীমিত মাত্রার বিচ্ছিন্ন বিদ্রোহ নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তান একই সময়ে একাধিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলা করছে। আফগান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়ায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপির হামলা বেড়েছে। অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং নিরাপত্তা সংকট একসঙ্গে চললে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
ইসলামাবাদ কাদের দায়ী করছে?
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহায়তা করছে ভারত। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বিএলএকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর ‘প্রক্সি’ হিসেবে বর্ণনা করেন। সাম্প্রতিক হামলার পরও একই অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে ভারত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য, পাকিস্তান নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংকটের দায় অন্য দেশের ওপর চাপাচ্ছে।
পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছে যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আফগান ভূখণ্ডে আশ্রয় পাচ্ছে। যদিও কাবুলের তালেবান সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে উপস্থাপিত তথ্যের ভিত্তিতে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এবার কী হতে পারে?
বেলুচিস্তানের সামনে সম্ভাব্য কয়েকটি পথ রয়েছে।
সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি হলো, পাকিস্তান সামরিক অভিযান আরও জোরদার করতে পারে। বড় হামলার পর নিরাপত্তা বাহিনী সাধারণত দুর্গম এলাকায় অভিযান, তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং নজরদারি বাড়ায়। এতে স্বল্প মেয়াদে বিএলএর তৎপরতা কমতে পারে।
তবে বড় ধরনের অভিযানে বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ বাড়লে নতুন করে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, কঠোর সামরিক পদক্ষেপ অনেক সময় বিদ্রোহ দমন করলেও দীর্ঘ মেয়াদে নতুন সদস্য সংগ্রহে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করেছে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো রাজনৈতিক সংলাপ। বেলুচ রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি—সম্পদের ন্যায্য অংশ, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে জবাবদিহি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করা।
কিন্তু বড় হামলা ও পাল্টা অভিযানের বর্তমান পরিবেশে সংলাপের সম্ভাবনা দুর্বল। পাকিস্তান সরকার বিএলএকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেখে এবং সংগঠনটির সঙ্গে আলোচনার পরিবর্তে সামরিকভাবে পরাজিত করার নীতি অনুসরণ করছে।
তৃতীয় সম্ভাবনা হলো সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়া। বিএলএ যদি বড় শহর, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক, গদর বন্দর বা চীনা প্রকল্পে হামলা বাড়ায়, তাহলে পাকিস্তান আরও কঠোর অভিযান চালাতে পারে। এতে সহিংসতার চক্র দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত বাস্তবতা কী?
বেলুচিস্তানে যা ঘটছে, তা কেবল কয়েকটি বিচ্ছিন্ন হামলা নয়। এটি কয়েক দশকের রাজনৈতিক বঞ্চনা, সম্পদের মালিকানা নিয়ে বিরোধ, জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর অবিশ্বাসের ফল।
বিএলএ এখন আগের তুলনায় বেশি সংগঠিত ও আক্রমণাত্মক। সাম্প্রতিক হামলাগুলো দেখিয়েছে, পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীকে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবির বিপরীতে, সংগঠনটি এখনও বেলুচিস্তানের ওপর স্থায়ী প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করেনি।
তাই ‘পাকিস্তান ভেঙে যাচ্ছে’—এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া মানে বাস্তবতার চেয়ে অনেক এগিয়ে যাওয়া হবে।
তবে এটাও সত্য, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে বেলুচিস্তানের সংকটের স্থায়ী সমাধান এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি। প্রায় আট দশক ধরে বিদ্রোহ দমন ও পুনরুত্থানের যে চক্র চলছে, সাম্প্রতিক সহিংসতা তার আরও শক্তিশালী রূপ।
পাকিস্তান যদি বেলুচ জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সম্পদের ন্যায্য অংশ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিচার এবং মানবাধিকারের অভিযোগগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে না পারে, তাহলে বিএলএ সামরিকভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে না পারলেও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে।
অর্থাৎ, বেলুচিস্তান এখনও পাকিস্তানের অংশ এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সেখানে কার্যকর। কিন্তু সহিংসতার সাম্প্রতিক বিস্তার দেখাচ্ছে, প্রদেশটির সংকট আর উপেক্ষা করার মতো নয়।
এটি পাকিস্তানের জন্য শুধু একটি নিরাপত্তা সমস্যা নয়—বরং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংহতি, অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় এক পরীক্ষা।

