মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নতুন করে আরও জটিল রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের জবাবে ইরান প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামোয় নতুন করে হামলা পরিচালনা করেছে। ফলে কয়েক দিন আগে ভেঙে যাওয়া যুদ্ধবিরতির পর অঞ্চলটি আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
বুধবার (১৫ জুলাই) সংঘাতের নতুন অধ্যায়ে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কৌশলগত সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে, অন্যদিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস দাবি করে, তারা বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকালে প্রথম দফায় ইরানের গ্রেটার তুনব দ্বীপে উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালানো হয়। প্রায় নয় ঘণ্টা পর দ্বিতীয় দফায় ইরানের বিভিন্ন স্থানে আরও হামলা পরিচালিত হয়।
মার্কিন বাহিনীর দাবি, এসব অভিযানে সামরিক কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এবং উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর বান্দার আব্বাস এবং সেখানে থাকা নৌবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ডের বিভিন্ন স্থাপনাও হামলার আওতায় আসে।
এই অভিযানের পরপরই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস জানায়, তারা বাহরাইন, কুয়েত ও জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
তাদের দাবি অনুযায়ী, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের বিভিন্ন স্থাপনা এবং একটি রাডার ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু ছিল। যদিও হামলার ফলে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র জর্ডানের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসির জনসংযোগ বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, এসব হামলার একটি শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্রসংবলিত একটি হাসপাতালের আশপাশে আঘাত হানে। নিরাপত্তাজনিত কারণে সেখান থেকে ১২১ জন শিশুকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি জানায়, তাদের মহাকাশ বাহিনী জর্ডানের আজরাক বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে খাইবার শেকান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। সংগঠনটির দাবি, ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান রাখার একটি হ্যাঙ্গার এবং পশ্চিম এশিয়ায় ব্যবহৃত একটি নতুন কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে তাৎক্ষণিক নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একই বিবৃতিতে আইআরজিসি জর্ডানের জনগণের প্রতিও বার্তা দেয়। তারা অভিযোগ করে, জর্ডানের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হচ্ছে। তাই দেশটির জনগণকে নিজেদের ভূখণ্ড বিদেশি সামরিক অভিযানে ব্যবহারের বিরোধিতা করার আহ্বান জানায় আইআরজিসি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
চলমান সংঘাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। গত শনিবার রাতে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধের ঘোষণা দেয় ইরান। এরপর থেকেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো। ফলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার প্রভাব দ্রুতই বিশ্ববাজারে পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে পৌঁছেছে, যা এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নৌপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে শুধু জ্বালানি বাজার নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার লক্ষ্যেই ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে তারা দাবি করেছে, ইরানের খারগ দ্বীপের দিকে যাচ্ছিল একটি খালি তেলবাহী জাহাজকে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও সেটি না থামায় হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে অচল করে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার থেকে পুনরায় নৌ অবরোধ শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত দুটি জাহাজকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে এবং একটি জাহাজ অচল করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।
ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যম জানিয়েছে, বান্দার আব্বাস, আহভাজ, কোনারাক, সিরিক ও কেশমসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী তেহরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে খোন্দাব শহরেও অন্তত দুটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় তেহরানে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, আহভাজের একটি হাসপাতালের কাছেও হামলা হয়েছে। হাসপাতালটিতে শিশুদের ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র থাকায় নিরাপত্তার স্বার্থে রোগীদের সাময়িকভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রথম দফার হামলার পর ইরানের শীর্ষ নেতা মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেন, দেশটি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে “অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ” লড়ছে। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার বিষয়েও জোর দেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য—তিন ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা দ্রুত বাড়ছে। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর উভয় পক্ষের ধারাবাহিক পালটা অভিযানে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। কূটনৈতিক সমাধানের কোনো স্পষ্ট অগ্রগতি না থাকায় সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা।

