ব্রাজিলের আমদানিকৃত পণ্যের ওপর নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সময় বুধবার (১৫ জুলাই) এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২২ জুলাই থেকে নতুন শুল্কনীতি কার্যকর হতে পারে। এই পদক্ষেপের ফলে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আবারও উত্তেজনার মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা।
মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সব ধরনের পণ্যের ওপর এই শুল্ক কার্যকর হবে না। গোশত, কফি, নির্দিষ্ট কিছু উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত হয় না—এমন কয়েকটি পণ্যকে শুল্কের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে কৌশলগত ও প্রয়োজনীয় কিছু খাতে আগের মতোই আমদানি অব্যাহত থাকবে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের প্রধান জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ব্রাজিলের কিছু বাণিজ্যনীতি মার্কিন উৎপাদক ও শ্রমিকদের জন্য বৈষম্যমূলক পরিবেশ তৈরি করছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রত্যাশিত সুযোগ পাচ্ছেন না। তবে তিনি এটিও জানান, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে ব্রাজিলের সঙ্গে আলোচনার পথ এখনো খোলা রয়েছে।
এর আগে পরিচালিত এক তদন্তে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, ব্রাজিলের কিছু নীতি ‘অযৌক্তিক’, ‘বৈষম্যমূলক’ এবং মার্কিন বাণিজ্যের জন্য প্রতিবন্ধক। বিশেষ করে ডিজিটাল বাণিজ্য ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইলেকট্রনিক অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা পিক্স নিয়ে ওয়াশিংটনের আপত্তি রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই ব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধের বাজারে মার্কিন ঋণকার্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নতুন এই শুল্ক ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের সেকশন ৩০১-এর আওতায় আরোপ করা হচ্ছে। একই আইনি বিধান ব্যবহার করে চলতি বছর আরও কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি জোরপূর্বক শ্রম ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে একাধিক বাণিজ্য অংশীদারের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।
ওয়াশিংটনের দাবি, তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাইলেও ব্রাজিলের কাছ থেকে দ্রুত নীতিগত পরিবর্তন প্রত্যাশা করছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ব্রাজিল যেভাবে মেক্সিকো ও ভারতকে বিশেষ শুল্ক সুবিধা দেয়, যুক্তরাষ্ট্রও একই ধরনের অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা চায়। তবে এই তদন্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে—এমন অভিযোগ মার্কিন প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, ব্রাজিল তাৎক্ষণিকভাবে পালটা কোনো কঠোর পদক্ষেপ নাও নিতে পারে। তবে যদি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
চলতি মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক গণশুনানিতে ব্রাজিলের অনুদারপন্থি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো নতুন শুল্ক আরোপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি যুক্তি দেন, অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন। উল্লেখ্য, ফ্লাভিও হলেন ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে।
আগামী অক্টোবরে ব্রাজিলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন শুল্ক কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
উল্লেখ্য, গত বছর জাইর বলসোনারোর অভ্যুত্থানচেষ্টার বিচারকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হলে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিল। পরে দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সেই শুল্কের বড় অংশ প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্কের ঘোষণায় আবারও ওয়াশিংটন ও ব্রাসিলিয়ার বাণিজ্য সম্পর্ক অনিশ্চয়তার নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করল।

