বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার প্রযুক্তি খাতের পুরোনো ব্যবসায়িক মডেলগুলোকে বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে প্রত্যাশিত গতিতে খাপ খাওয়াতে না পারার কথা স্বীকার করেছে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএম। আর সেই স্বীকারোক্তির পরপরই শেয়ারবাজারে বড় ধাক্কার মুখে পড়ে শতবর্ষী এই কোম্পানি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম *ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস* ও বার্তা সংস্থা *রয়টার্স* জানায়, আইবিএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অরবিন্দ কৃষ্ণ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, চলমান এআই বিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রতিষ্ঠানটি যথেষ্ট দ্রুত এগোতে পারেনি। এর ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক চুক্তি প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি এবং চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) আয়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এই মন্তব্যের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। একদিনেই আইবিএমের শেয়ারদর প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এতে কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার কমে যায়। শেয়ারবাজারের ইতিহাসে ১৯৬৮ সালের পর একদিনে আইবিএমের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় পতন। এর আগে ১৯৮৭ সালের শেয়ারবাজার ধসের সময় কোম্পানিটির শেয়ারদর ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছিল।
কেন চাপে পড়েছে আইবিএম?
দীর্ঘদিন ধরে আইবিএম বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাগুলোকে মেইনফ্রেম কম্পিউটার, এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার এবং তথ্যপ্রযুক্তি পরামর্শসেবা দিয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গ্রাহকদের ব্যয়ের অগ্রাধিকার দ্রুত বদলে গেছে।
অরবিন্দ কৃষ্ণ জানান, জুন মাসের শেষ কয়েক সপ্তাহে অনেক গ্রাহক সফটওয়্যার ও প্রচলিত প্রযুক্তি সেবায় বিনিয়োগ কমিয়ে এআই সার্ভার, স্টোরেজ, মেমোরি ও অন্যান্য অবকাঠামো কেনার দিকে ঝুঁকেছেন। গ্রাহকদের এই পরিবর্তনের মাত্রা প্রতিষ্ঠানটির প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান সীমিত প্রযুক্তি বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করছে এআই-নির্ভর অবকাঠামো তৈরিতে। ফলে প্রচলিত সফটওয়্যার ও আইটি সেবার চাহিদা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে আইবিএমের ওপর।
আইবিএমের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস মেইনফ্রেম ব্যবসা। এই খাতের মাধ্যমে ব্যাংক, বিমান সংস্থা এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার ও সফটওয়্যার সরবরাহ করা হয়। তবে গ্রাহকদের বিনিয়োগের অগ্রাধিকার বদলে যাওয়ায় এই ব্যবসাও এখন চাপে রয়েছে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা খাতেও ব্যয় বাড়ছে, কারণ এআই প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলাও আরও জটিল হয়ে উঠছে।
অরবিন্দ কৃষ্ণ বলেন, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের ধরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি অ্যানথ্রপিকের ‘মিথোস’ মডেলের কথা উল্লেখ করেন, যা বিদ্যমান সফটওয়্যার ও এনক্রিপশন ব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত করতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়।
আয়ের পূর্বাভাসও হতাশাজনক:
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে আইবিএম মাত্র ১ শতাংশ আয় প্রবৃদ্ধির আশা করছে। গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি কোম্পানিটির সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস। রয়টার্স ও লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় প্রান্তিকে আইবিএমের আয় প্রায় ১ হাজার ৭২০ কোটি ডলার হতে পারে। অথচ ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের গড় পূর্বাভাস ছিল প্রায় ১ হাজার ৭৮৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ প্রত্যাশার তুলনায় প্রায় ৬৬ কোটি ডলার কম আয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সংকট:
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্পের মতে, আইবিএমসহ পুরো সফটওয়্যার শিল্প এখন একটি কঠিন সময় পার করছে। তার ভাষায়, এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এআই অবকাঠামো ও সাইবার নিরাপত্তায় অতিরিক্ত বিনিয়োগের এই প্রবণতা কতদিন চলবে। যদি এটি আরও কয়েক মাস অব্যাহত থাকে, তাহলে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান সংকট কাটাতে কয়েক বছর ধরেই প্রচলিত মেইনফ্রেম ব্যবসার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে আইবিএম। উচ্চ মুনাফার ক্লাউড প্ল্যাটফর্ম ‘রেড হ্যাট’-এ বিনিয়োগ বাড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এআইকেন্দ্রিক বাজার পরিবর্তনের কারণে সেই রূপান্তরও প্রত্যাশিত গতি পায়নি।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে আইবিএম এখন ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির পরিকল্পনাকে সামনে আনছে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রথম বৃহৎ পরিসরের বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির লক্ষ্য রয়েছে তাদের। এ প্রকল্পে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং এআই-সংক্রান্ত অংশীদারত্বগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই অল্প সময়ের মধ্যে এসব উদ্যোগ থেকে এমন আয় আসার সম্ভাবনা কম, যা আইবিএমের মূল সফটওয়্যার ও অবকাঠামো ব্যবসার বর্তমান দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে।
এখন বিনিয়োগকারীদের নজর ২২ জুলাই প্রকাশিত হতে যাওয়া আইবিএমের দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলের দিকে। সেই প্রতিবেদনই দেখাবে, এআই-নির্ভর প্রযুক্তি পরিবর্তনের এই ধাক্কা কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থায় কতটা গভীর প্রভাব ফেলেছে।

