লোহিত সাগর আর ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি সরু জলপথ—বাব এল-মান্দেব প্রণালী। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই করিডোর এখন নতুন এক হুমকির মুখে। ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ইরানের পক্ষ হয়ে এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে, যা বিশ্ব বাণিজ্যকে আরও গভীর সংকটে ফেলে দিতে পারে। এর আগেই হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণে রেখে তেহরান বিশ্ব অর্থনীতির উপর যে চাপ সৃষ্টি করেছে, এবার সেই একই কৌশল প্রয়োগের প্রস্তুতি চলছে লোহিত সাগরের অপর প্রান্তেও।
দ্য টেলিগ্রাফের কাছে একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান লোহিত সাগরের অপর পাড়টিও নিয়ন্ত্রণে নিতে ইচ্ছুক, যাতে হরমুজ প্রণালীর মতো একই ধরনের কৌশলগত পরিস্থিতি তৈরি করা যায়।
দুটি প্রণালী, একই কৌশল
বাব এল-মান্দেব প্রণালী অবস্থিত আরব উপদ্বীপের পশ্চিম পাশে, হরমুজ প্রণালীর ঠিক বিপরীত দিকে, এবং এটি লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে একটি কৌশলগত সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে।
ইয়েমেনভিত্তিক সূত্রগুলোর বরাতে জানা গেছে, তেহরানের সবচেয়ে সক্ষম আঞ্চলিক মিত্র বাহিনী হুথি বিদ্রোহীরা ধীরে ধীরে এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং নিঃশব্দে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল পর্যন্ত।
প্রণালীর উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত ইয়েমেনে থাকা হুথিরা সোমালিয়ার জঙ্গি গোষ্ঠী আল-শাবাবের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জলপথের দুই পাড়ই নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছে। এর মূল লক্ষ্য হলো বিশ্ব অর্থনীতির উপর আরও চাপ সৃষ্টি করা এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ানো।
ওই সূত্রটি জানিয়েছে, হুথি ও আল-শাবাবের মধ্যে সমন্বয়ের অনেক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যার লক্ষ্য ভবিষ্যতে ইরান সিদ্ধান্ত নিলে বাব এল-মান্দেব প্রণালী পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বন্ধ করে দেওয়া। সূত্র মতে, ইরানের পক্ষ থেকে ড্রোন প্রযুক্তি আল-শাবাবের কাছে হস্তান্তর করছে হুথিরা, যার ফলে তারা অঞ্চলটিতে ক্রমশ নেতৃস্থানীয় শক্তি হয়ে উঠছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই দুই প্রণালী
হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—দুটি প্রণালীই বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুয়েজ খালের সঙ্গে সংযুক্ত বাব এল-মান্দেব দিয়ে বিশ্বের বার্ষিক সমুদ্রবাণিজ্যের প্রায় দশ থেকে বারো শতাংশ পরিবাহিত হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তখন তেহরান কার্যত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। এর ফলে তেল, সার এবং আরও অনেক পণ্যের দাম আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে, আর ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনায় ইরান পায় গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা।
সূত্রটি আরও জানিয়েছে, হরমুজের মতোই বাব এল-মান্দেবকেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়াটা ইরান ও হুথিদের যৌথ কৌশলের একটি অংশ।
তবে আপাতত হুথিরা সংযত অবস্থানে আছে। সূত্র জানিয়েছে, শুরুতেই সব কৌশলগত তাস একসঙ্গে ব্যবহার করা ইরানের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করছে হুথিরা
যুদ্ধে তেহরানের অধিকাংশ শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা শিরশ্ছেদ-ধরনের হামলা প্রতিরোধে ইরানের কাছ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে হুথিরা। তারা প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য একাধিক উত্তরসূরি নির্ধারণ করে রাখছে এবং দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।
হুথি গোষ্ঠীর প্রধান আবদুল মালিক আল-হুথি ইতিমধ্যে নিজের পরিবারের একজন সদস্যকে উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করে রেখেছেন, যাতে তিনি নিহত হলেও নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি না হয়। এটি তাদের “ছায়া-নেতৃত্ব” কাঠামোর অংশ।
প্রণালী বন্ধ হলে কী ঘটবে
বাব এল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি করবে, কারণ তখন জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে সপ্তাহব্যাপী দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, যা বিশ্বজুড়ে পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেবে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—এই দুই প্রণালী একসঙ্গে কখনোই বন্ধ হয়নি। তবে অতীতে হুথিরা প্রমাণ করেছে যে তারা এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। গাজা যুদ্ধ চলাকালে তারা মাসের পর মাস লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছিল, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাঠানো একটি নৌ-জোটের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বিশ্বের বেশিরভাগ শিপিং কোম্পানি এই পথ এড়িয়ে চলতে বাধ্য হয়েছিল।
লেবাননে হিজবুল্লাহর উপর ইসরায়েলি হামলার পর এবং ইরানের নিজস্ব কমান্ড কাঠামোর একটি বড় অংশ নিহত হওয়ার পর, ইরানের “প্রতিরোধ অক্ষ” জোটের মধ্যে হুথিরা এখন সবচেয়ে সক্ষম ও স্বাধীনভাবে কার্যকর শক্তি হয়ে উঠেছে।
মিত্র, তবে পুতুল নয়
তবে হুথিদের ইরানের নিছক পুতুল বাহিনী ভাবাটা ভুল হবে। তারা সানায় অবস্থিত নিজস্ব নেতৃত্বের কাছে দায়বদ্ধ, সৌদি আরবের সঙ্গে নিজেদের যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান থেকে পাওয়া যে ড্রোন প্রযুক্তি হুথিরা আল-শাবাবের সঙ্গে ভাগাভাগি করছে বলে জানা যাচ্ছে, তা এই গোষ্ঠীর নিজস্ব প্রভাব-বলয়কে ইরানের নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বতন্ত্রভাবে সম্প্রসারিত করবে, যদিও তা একইসঙ্গে তেহরানের স্বার্থও পূরণ করবে।
এই স্বায়ত্তশাসন ইরানকে অস্বীকারের সুযোগ দেয় ঠিকই, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তেহরান পুরোপুরি সময় বা শর্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
ইরানের প্রকাশিত কৌশলপত্র
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত একটি নীতিদলিলে বাব এল-মান্দেবকে যেকোনো বৃহত্তর যুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওই দলিলে বলা হয়েছিল, হরমুজের পাশাপাশি এই প্রণালীও বন্ধ করে দেওয়া হবে, যাতে শত্রুদের “অর্থায়ন ও রসদ সরবরাহ” ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করা যায় এবং বিশ্ব বাণিজ্য স্তব্ধ করে দেওয়া যায়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হুথিদের স্বার্থ ইরানের স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি অভিন্ন নয়। বাব এল-মান্দেব বন্ধ করা তেহরানের জন্য উপকারী হলেও, এর মাধ্যমে হুথিরা তাদের দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ সৌদি আরবকেও শাস্তি দিতে পারবে এবং নিজস্ব আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগিয়ে নিতে পারবে। অর্থাৎ হুথিরা হয়তো নিজেদের কারণেই কাজ করছে, যা কাকতালীয়ভাবে ইরানের স্বার্থের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
নতুন করে জ্বলে ওঠা উত্তেজনা
এই ভেতরের টানাপোড়েন ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে। সৌদি আরব কার্যত যুদ্ধে একটি নতুন ফ্রন্ট খুলেছে—গত সোমবার তারা সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে বিমান হামলা চালায়, যাতে একটি ইরানি বিমান হুথি-নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের রাজধানীতে অবতরণ করতে না পারে।
এই হামলার দায় স্বীকার করেছে রিয়াদ-সমর্থিত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার, যদিও তাদের কোনো কার্যকর বিমানবাহিনী নেই। অন্যদিকে হুথিদের এক মুখপাত্র সরাসরি সৌদি আরবকে দায়ী করেছেন।
জবাবে হুথিরা দক্ষিণ সৌদি আরব লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে, যা সৌদি আরব দাবি করেছে তারা প্রতিহত করেছে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ২০২২ সালের মার্চ থেকে মোটামুটি অক্ষুণ্ন থাকা যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ে।
উল্লেখ্য, এই যুদ্ধবিরতির আগে প্রায় এক দশক ধরে চলা যুদ্ধে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী প্রায় তিন লাখ সাতাত্তর হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই মারা গিয়েছিলেন অনাহার এবং অবকাঠামোর ভেঙে পড়ার কারণে।
যুদ্ধ এখন চতুর্থ দিনে
বাব এল-মান্দেব প্রণালী ঘিরে এই কৌশলগত মহড়া এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ টানা চতুর্থ দিনে গড়িয়েছে। গত রাতে ইরান কুয়েত, জর্ডান ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
এই হামলাগুলো এমন সময়ে হলো যখন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে যে তারা হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি অবস্থিত বহু সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে, যাতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হুমকি সৃষ্টির ইরানি সক্ষমতা আরও দুর্বল করা যায়।
কেন এই মুহূর্তটি গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—এই দুই প্রণালী একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ইতিহাসে কখনো ঘটেনি। যদি এবার তা সত্যিই ঘটে, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে পড়বে। জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য পর্যন্ত—সবকিছুর সরবরাহ শৃঙ্খলে এর প্রভাব পড়বে বিশ্বজুড়ে।
তবে এই পরিস্থিতির সবচেয়ে জটিল দিকটি হলো, হুথিরা নিছক ইরানের নির্দেশ পালনকারী কোনো বাহিনী নয়। তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থ, নিজস্ব শত্রুতা এবং নিজস্ব সময়সূচি আছে। ফলে ইরান চাইলেও পুরোপুরি এই পরিস্থিতির লাগাম নিজের হাতে রাখতে পারবে না। এই অনিশ্চয়তাই বিশ্ব বাণিজ্য ও কূটনীতির জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

