মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত এখন আর শুধু সামরিক লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্লেষকদের মতে, যে লক্ষ্য সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল, পরিস্থিতি এখন তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত মাত্রা পেয়েছে। সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ—হরমুজ প্রণালি। এই প্রণালিকে ঘিরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), সার এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য হরমুজ প্রণালি হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। ফলে এই পথের স্বাভাবিক কার্যক্রমে যেকোনো বিঘ্নের প্রভাব দ্রুত বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সংঘাতের পর হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে অবাধ নৌ চলাচলের দীর্ঘদিনের নীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল এই উন্মুক্ত নৌ চলাচলের ব্যবস্থা।
জ্বালানি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক এরিক গ্রুন্ডটের মতে, এমন পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ নজির তৈরি করবে। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তাদেরই।
হরমুজকে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার:
সংঘাত শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। একই সঙ্গে এটি অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবেও সামনে এসেছে।
বর্তমানে এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বিদেশি জাহাজগুলোকে ইরানের নবগঠিত পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষের (পিজিএসএ) সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এ জন্য অর্থও পরিশোধ করতে হচ্ছে। অন্যথায় জাহাজগুলো ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বা ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের আশঙ্কা।
গত ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার পর টোল আদায় সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। তেহরানের দাবি, ওই সমঝোতার একটি ধারা তাদের বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে। সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই তারা নিজেদের ভূমিকা তুলে ধরছে।
ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পর তিন সপ্তাহে ২০০টির বেশি বিদেশি জাহাজ তাদের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ অতিক্রম করেছে। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ব্যাখ্যা ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসনের ধারণা ছিল, সমঝোতার সময়কালে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো কোনো অতিরিক্ত বিধিনিষেধ ছাড়াই হরমুজ ব্যবহার করতে পারবে।
সমঝোতার পর কিছুদিন পরিস্থিতির উন্নতি হলেও তা স্থায়ী হয়নি। প্রতিদিন প্রায় ৭০টি জাহাজ চলাচল করছিল, যা যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের প্রায় অর্ধেক। তবে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় চলাচল আবার কমে গেছে। সর্বশেষ একদিনে এই প্রণালি দিয়ে মাত্র এক ডজনের কিছু বেশি জাহাজ চলাচল করেছে।
পরিস্থিতির মধ্যে একপর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে ২০ শতাংশ মাশুল আদায় করবে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এই ঘোষণার এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে আসেন।
আন্তর্জাতিক শিপিং সংগঠন বিমকোর হিসাব অনুযায়ী, এমন মাশুল কার্যকর হলে একটি অতি বৃহৎ তেলবাহী জাহাজকে (ভিএলসিসি) প্রতি যাত্রায় অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হতো। বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে এমন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও ট্রাম্পের প্রস্তাব ইরানের অবস্থানকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। এ নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মন্তব্য করেন, ২০ শতাংশ মাশুল অনেক বেশি, ইরান ন্যায্য হারে মাশুল আদায় করবে।
হরমুজে নিয়মিত টোল আদায় শুরু হলে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হতে পারে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিমা ব্যবস্থায়। ইরান তেলবাহী জাহাজ থেকে প্রতি ব্যারেল তেলের বিপরীতে ১ থেকে ২ ডলার পর্যন্ত আদায় করছিল। এতে প্রতিটি ভিএলসিসি থেকে প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত রাজস্ব অর্জন সম্ভব ছিল।
জাহাজমালিকদের একটি অংশ এই ব্যয় মেনে নিতে প্রস্তুত থাকলেও বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ পরিশোধ করলে আন্তর্জাতিক বিমা কোম্পানিগুলো সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিমা বাতিল করতে পারে।
আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিভেয়ার গ্রুপের প্রধান নির্বাহী নাইজেল গ্রিন বলেন, আইনি বিরোধ নিষ্পত্তির অপেক্ষা না করেই বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি এড়াতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। যদি টোল পরিশোধের সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা যুক্ত হয়, তাহলে তারা সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিমা কভারেজ বাতিল করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এমনকি ওমানের মতো কোনো তৃতীয় পক্ষ টোল সংগ্রহ করলেও আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের প্রশ্ন পুরোপুরি এড়ানো যাবে না। সে ক্ষেত্রেও বিমা কোম্পানিগুলো সতর্ক অবস্থান নিতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শুধু হরমুজকে ঘিরে নয়। যদি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে টোল আরোপের এই ধারা গ্রহণযোগ্যতা পায়, তাহলে বিশ্বের অন্যান্য দেশও একই ধরনের ব্যবস্থা বিবেচনা করতে পারে। ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, তাইওয়ান কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো দেশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে একই ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালুর কথা ভাবতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রিস্টাড এনার্জির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ, মালাক্কা, জিব্রাল্টার, ডোভার ও তাইওয়ান প্রণালিসহ বিশ্বের ১০টি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে যদি টোল ব্যবস্থা চালু হয়, তাহলে বছরে প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, এমন প্রবণতা বৈশ্বিক বাণিজ্যকে আরও ব্যয়বহুল ও বিভক্ত করে তুলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সামরিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে জ্বালানি বাজারে। শেষ পর্যন্ত এর মূল্য গুনতে হবে বিশ্বজুড়ে ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

