যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। পাল্টাপাল্টি হামলা, কঠোর বক্তব্য এবং সামরিক প্রস্তুতির কারণে অনেকেই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা প্রকাশ করলেও, ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনের উল্লেখযোগ্য অংশ ভিন্ন মূল্যায়ন করছে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হলেও কোনো পক্ষই দীর্ঘমেয়াদি সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই-এর পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, ইরানের বিভিন্ন রাজনৈতিক ধারা ও মতাদর্শের নেতাদের মধ্যে একটি বিষয়ে বিস্ময়কর মিল রয়েছে। তারা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ বজায় রাখলেও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চায় না। একইভাবে ইরানও সরাসরি বড় ধরনের সংঘাতের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া ও কৌশলগত অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এই মূল্যায়নের অংশ হিসেবে ইরানের সংবাদমাধ্যম খবর অনলাইন দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের পাঁচজন বর্তমান ও সাবেক নেতার মতামত প্রকাশ করে। মতপার্থক্য থাকলেও প্রায় সবাই একমত হয়েছেন যে, ভবিষ্যতে সীমিত সামরিক সংঘাত, কূটনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক দরকষাকষি একই সঙ্গে চলতে পারে। তবে তা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
ইরানের সাবেক মধ্যপন্থী আইনপ্রণেতা আলী মোতাহেরির মতে, সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা বড় ধরনের যুদ্ধে রূপ নেবে—এমন সম্ভাবনা খুবই সীমিত। তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই এমন যুদ্ধ চায় না, যার পরিণতি দীর্ঘমেয়াদি ও অনিশ্চিত হতে পারে।
একই ধরনের বিশ্লেষণ দিয়েছেন রক্ষণশীল রাজনীতিক মোহসেন কুহকান। তিনি মনে করেন, ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক কঠোর বক্তব্য মূলত চাপ সৃষ্টির কৌশল। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুত নয় এবং বর্তমান হুমকিগুলোর লক্ষ্য মূলত প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখা।
যদিও রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন, তবুও ইরানের প্রশাসনিক মহল সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। রাজধানী তেহরানের সিটি কাউন্সিল নতুন ভবন নির্মাণে বাধ্যতামূলক আশ্রয়কেন্দ্র রাখার একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে। পাশাপাশি মেট্রো স্টেশন, ভূগর্ভস্থ পার্কিং এবং অন্যান্য জনসাধারণের স্থাপনাকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক সংঘাতের অভিজ্ঞতা। ২০২৫ সালের জুন থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের সময় রাজধানীতে পর্যাপ্ত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। নগর পরিকল্পনাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও তখন এ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
ইরানি দৈনিক শারঘ জানিয়েছে, নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে যেকোনো নতুন ভবনের নকশায় নিরাপদ আশ্রয়স্থল রাখা বাধ্যতামূলক হবে। এই শর্ত পূরণ না হলে সংশ্লিষ্ট ভবন ব্যবহারের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হবে না।
অন্যদিকে, দেশের সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক মহল যুদ্ধকেন্দ্রিক বক্তব্য থেকে সরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে। সংস্কারপন্থী রাজনীতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব মসিহ মোহাজেরি এক নিবন্ধে বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করা ইরানের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তার মতে, প্রতিশোধের আবেগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও রাজনৈতিক বিচক্ষণতাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কট্টরপন্থী অংশই দীর্ঘ সংঘাত থেকে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে। তাই আবেগের পরিবর্তে বাস্তবতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়াই ইরানের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হবে। তার মতে, ধৈর্য, কৌশল এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই দেশ নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাবেক কমান্ডার মোহসেন রেজায়ির সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলেও দেশের ভেতরে তা তেমন গুরুত্ব পায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক রাজনৈতিক বন্দি আহমাদ জেইদাবাদী এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, রেজায়ির বক্তব্যকে বিদেশি গণমাধ্যম যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, বাস্তবে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তার রাজনৈতিক প্রভাব ততটা নয়। তিনি বিশেষভাবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে রেজায়ির মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, অনেক বিদেশি সংবাদমাধ্যম ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার তুলনায় কিছু বক্তব্যকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করছে।
জেইদাবাদীর মতে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় উপদেষ্টা পদে থাকা অনেক ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক মর্যাদা থাকলেও প্রকৃত নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা মূল নেতৃত্বের হাতেই কেন্দ্রীভূত থাকে। ফলে কোনো ব্যক্তির মন্তব্যকে রাষ্ট্রীয় অবস্থান হিসেবে দেখার আগে বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন যে মূল্যায়নটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা হলো—উত্তেজনা অব্যাহত থাকবে, সীমিত সামরিক সংঘর্ষও হতে পারে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে আগ্রহী নয়। একই সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, সামরিক প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক চাপ—এই তিনটি পথই সমান্তরালভাবে চলতে পারে বলে ধারণা করছেন দেশটির প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা।

