মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটের প্রেক্ষাপটে কুয়েত ও পাকিস্তান একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, তেল সংরক্ষণ এবং বিনিয়োগ সহযোগিতাকেও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও দুই দেশই ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা যাচাই করছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, চলমান আলোচনায় কুয়েত তাদের নিরাপত্তা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পাকিস্তানের কাছ থেকে বিস্তৃত সামরিক সহযোগিতা চেয়েছে। তবে আলোচনার অগ্রগতি অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার ওপর। আঞ্চলিক পরিস্থিতি আরও জটিল হলে এই আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং ইয়েমেনভিত্তিক হুথিদের হামলার পর পাকিস্তান সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান নেয়। সেই প্রেক্ষাপটে কুয়েতের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
জানা গেছে, ২০২৩ সাল থেকেই কুয়েত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমিত পরিসরে সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়ার চুক্তি কার্যকর রয়েছে। তবে এবার কুয়েত আরও বিস্তৃত সহযোগিতা চাচ্ছে। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন, যুদ্ধবিমান, ড্রোন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক অবকাঠামোগত সহায়তার বিষয়ও রয়েছে।
তবে পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কুয়েতের চাহিদা অনেক বিস্তৃত হলেও ইসলামাবাদ এখনই সেখানে যুদ্ধরত সেনা পাঠানোর বিষয়ে আগ্রহী নয়। তাদের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কয়েক দশকের কৌশলগত অংশীদারত্বের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও কুয়েতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিকগুলো সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের একটি সূত্র জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে এটি শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা এবং কুয়েতের তথ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, গত এক বছরে উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের বড় সামরিক বাহিনী, নিজস্ব যুদ্ধবিমান উৎপাদন সক্ষমতা এবং দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা কুয়েতসহ কয়েকটি দেশের কাছে তাকে সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেছে।
একজন মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, কুয়েতের দৃষ্টিতে পাকিস্তান তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি অংশীদার। কারণ দেশটির সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও কার্যকর যোগাযোগ বজায় আছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতেও তাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্কের মধ্যে একটি পৃথক যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়েও আলোচনা চলছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। একই ধরনের নিরাপত্তা সহযোগিতায় বাহরাইন আগ্রহ দেখিয়েছে এবং জর্ডানও অস্ত্র ও সামরিক প্রশিক্ষণসংক্রান্ত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করছে।
এই আলোচনায় পাকিস্তানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির চাপ কমাতে এবং তেলের কৌশলগত মজুত বাড়াতে কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে কুয়েত পাকিস্তানে বিশেষ তেল সংরক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করছে। এটি দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই চালু থাকা সরকারি পর্যায়ের ডিজেল সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি জ্বালানি ও বিনিয়োগে কুয়েতের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। তবে আলোচনার গতি মূলত নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমে এলে আলোচনা আরও দ্রুত এগোতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর আশা।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একটি অংশ সতর্ক করে বলছেন, পাকিস্তানকে নতুন প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। তাদের মতে, একাধিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তিতে অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতি দিলে ভবিষ্যতে ইসলামাবাদ কূটনৈতিক ও সামরিক—উভয় দিক থেকেই নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। তাই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের মধ্যে সমন্বয় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

