গত মাসে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পের ভয়াবহতা এখনো কাটেনি। উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতির সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫ হাজার ৬৯ জনে পৌঁছেছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের বড় একটি অংশ উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা, যেখানে ভূমিকম্পের আঘাত সবচেয়ে বেশি ছিল।
দেশটির ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ শুক্রবার নিজের টেলিগ্রাম বার্তায় সর্বশেষ প্রাণহানির তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, উদ্ধার অভিযান ও ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া তথ্য অনুযায়ী প্রাণহানি পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে।
২৪ জুন মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলাকে কাঁপিয়ে দেয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুটি শক্তিশালী কম্পন আঘাত হানায় বহু ভবন ধসে পড়ে এবং ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি হয়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাজধানী কারাকাসের উত্তরে অবস্থিত উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্য। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বহু আবাসিক ভবন, সড়ক, সরকারি স্থাপনা এবং জনসেবামূলক অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় উদ্ধারকাজও দীর্ঘ সময় ধরে চালাতে হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, ভূমিকম্পে আহতের সংখ্যা এখনো ১৬ হাজার ৭৪০ জন রয়েছে। তবে আশার খবর হলো, আহতদের বড় একটি অংশ চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে গেছেন। যদিও গুরুতর আহত অনেকেই এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ভূমিকম্পের আরেকটি বড় মানবিক সংকট হলো বাস্তুচ্যুতি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ হাজার মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন। এসব ক্যাম্পের অনেকগুলোতেই এখনো পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব রয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলো পুনর্গঠনের জন্য সরকার ইতোমধ্যে আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। শুক্রবার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ জানিয়েছেন, পুনর্গঠন কার্যক্রমে ৩৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার (৩৪৬ মিলিয়ন ডলার) ব্যবহার করা হবে, যা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সহায়তার আওতায় ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও সংস্থাটি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান শেষ হলেও ভেনেজুয়েলার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, নিরাপদ আবাসন নির্মাণ এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন। পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা হাজারো মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি এবং প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপর্যয় শুধু প্রাণহানির দিক থেকেই নয়, বরং অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করাও ভেনেজুয়েলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

