বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, সংঘাতের বড় অর্থনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে বড় ধরনের পতন ঘটেনি, তেলের দামও সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে নেমে এসেছে। কিন্তু এই আপাত স্থিতিশীলতার আড়ালে জমতে থাকা ঝুঁকিগুলো অনেক গভীর। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত একটি পুরোনো বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে—আর্থিক বাজারে যে চিত্র দেখা যায়, বাস্তব অর্থনীতির অবস্থা সব সময় তার সঙ্গে মেলে না। বড় বিনিয়োগকারী, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নত দেশের সরকারগুলো দ্রুত অর্থনৈতিক আঘাত সামাল দিতে পারলেও দরিদ্র দেশগুলোর পক্ষে একই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে একই যুদ্ধ ধনী ও দরিদ্র দেশের ওপর সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তেলের বাজারে আতঙ্ক, প্রত্যাশা ও বাস্তবতার লড়াই
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক তেলবাজারে অস্বাভাবিক ওঠানামা দেখা গেছে। তবে এই পরিবর্তনের সবটুকু সরাসরি চাহিদা ও সরবরাহের কারণে হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ঘোষণা, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা, নতুন হামলার খবর এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত অনিশ্চিত বক্তব্য বাজারের মনোভাবকে প্রভাবিত করেছে।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে বাধা তৈরি হয়। হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে এই জলপথে চলাচল ব্যাহত হওয়া মানেই বিশ্বের বহু দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া।
তবে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে সময় লাগে। তেল উৎপাদন কমে যাওয়া বা জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ার প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। বিভিন্ন দেশের মজুতেও কিছু তেল থাকে। এ কারণে যুদ্ধের প্রথম ধাক্কা বাস্তব বাজারে পুরোপুরি পৌঁছানোর আগেই তেলের দাম রাজনৈতিক খবর ও ভবিষ্যৎ আশঙ্কার ভিত্তিতে দ্রুত বাড়তে বা কমতে থাকে।
জুলাইয়ের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি সমঝোতার পর অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৭০ মার্কিন ডলারের নিচে নেমে আসে। এটি প্রায় ফেব্রুয়ারির দামের কাছাকাছি, যখন যুদ্ধ শুরু হয়নি। পরবর্তী সময়ে আবার সংঘাত শুরু হলেও তেলের দামে এখন পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে সীমিত বৃদ্ধি দেখা গেছে।
এখানেই একটি বড় বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। তেলের দাম কমে যাওয়া দেখে অনেকে ধরে নিতে পারেন যে সংকট শেষ হয়েছে। বাস্তবে বর্তমান দাম শুধু তাৎক্ষণিক বাজার পরিস্থিতির প্রতিফলন। যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শোধনাগার, কমে যাওয়া মজুত, দীর্ঘ পরিবহনপথ এবং সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি অনিশ্চয়তার প্রভাব বহু বছর ধরে থাকতে পারে।
পুঁজিবাজার কেন যুদ্ধকে প্রায় উপেক্ষা করছে
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা চললেও যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজার ভিন্ন পথে এগিয়েছে। এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশটির পুঁজিবাজার ২০২০ সালের পর সবচেয়ে ভালো ত্রৈমাসিক পার করেছে। জুলাইয়ের শুরুতেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত ছিল।
এই উত্থানের বড় অংশ এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়ার কারণে। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, নতুন শিল্প গড়ে তুলবে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় পরিবর্তন আনবে। এই প্রত্যাশা এতটাই শক্তিশালী যে যুদ্ধ, তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকিও পুঁজিবাজারে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারেনি।
উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রাথমিক প্রভাব সীমিত থাকাও বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ১.৯ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ১.৭ শতাংশে নামতে পারে। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি কমবে, তবে বড় ধরনের মন্দার পূর্বাভাস এখনো দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ২০২৬ সালে ২.৩ শতাংশ হারে বাড়তে পারে, যা ২০২৫ সালের ২.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির চেয়ে বেশি। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর বেকারত্বের হার এপ্রিলে ৫ শতাংশ ছিল। ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে এই হার প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায় যে উন্নত দেশগুলো এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল মুদ্রায় বিনিয়োগের প্রবাহ তাদের অর্থনীতিকে বাড়তি শক্তি দিয়েছে। চীন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো কয়েকটি এশীয় অর্থনীতিও প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুবিধা পেয়েছে।
কিন্তু পুঁজিবাজারের এই আশাবাদ পুরো পৃথিবীর বাস্তবতা নয়। বড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়লেও কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন খাত, আমদানিনির্ভর শিল্প এবং দরিদ্র পরিবারের ব্যয় একইভাবে স্বাভাবিক থাকে না।
যুদ্ধবিরতি মানেই সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক নয়
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তি আনলেও উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে আসেনি। এমনকি রপ্তানি পুরোপুরি স্বাভাবিক হলেও বর্তমান সংকটের কারণে তৈরি অর্থনৈতিক ক্ষতি নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে আরও কয়েক বছর বহন করতে হতে পারে।
উন্নত দেশগুলো জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সরকারি পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়েছে। এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মজুত থেকে প্রায় ৪৪০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়া হয়। এর বেশির ভাগই সরবরাহ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এই বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ার ফলে বাজারে সাময়িক ঘাটতি কমেছে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু একই ব্যবস্থা বারবার নেওয়া সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত এখন ধারণক্ষমতার অর্ধেকের নিচে নেমেছে এবং ৩৩ শতাংশ পরিচালনাগত সর্বনিম্ন সীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর মোট তেলের মজুতও কমছে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতে একই ধরনের বড় সংকট তৈরি হলে উন্নত দেশগুলোর কাছেও বাজারে বিপুল পরিমাণ তেল ছাড়ার সুযোগ আগের তুলনায় কম থাকবে। আর নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অধিকাংশেরই এমন কৌশলগত মজুত নেই।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা দেশগুলোকে বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং নতুন বাণিজ্যপথ খুঁজতে বাধ্য করবে। কিন্তু নতুন বন্দর, সংরক্ষণাগার, শোধনাগার, পাইপলাইন ও পরিবহনব্যবস্থা তৈরি করতে কয়েক বছর সময় এবং বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। ফলে পরিবর্তন প্রয়োজন হলেও তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, শোধনাগারের ক্ষতিও বড় ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক আলোচনায় সাধারণত অপরিশোধিত তেলের দাম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু আধুনিক অর্থনীতি শুধু অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভর করে না। তেল শোধনের মাধ্যমে তৈরি বিভিন্ন পণ্য শিল্প, কৃষি, স্বাস্থ্য, পরিবহন ও নির্মাণ খাতে অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুনে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য ও তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাসের রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের অর্ধেকেরও নিচে ছিল। যুদ্ধের কারণে অঞ্চলের কিছু শোধনাগার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু গাড়ির জ্বালানির সরবরাহ কমে না। রান্নার গ্যাস, বিমান জ্বালানি, শিল্পকারখানার কাঁচামাল, রাস্তা নির্মাণের উপকরণ এবং নানা ধরনের রাসায়নিক পণ্যের উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়।
একটি তেলক্ষেত্র থেকে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করা এবং সেই তেলকে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন পণ্যে রূপান্তর করা সম্পূর্ণ আলাদা প্রক্রিয়া। অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ফিরে এলেও ধ্বংস হওয়া শোধনাগার দ্রুত পুনর্নির্মাণ করা যায় না। ফলে বাজারে তেল থাকলেও প্রয়োজনীয় পরিশোধিত পণ্যের ঘাটতি থেকে যেতে পারে।
সারের দাম বাড়লে খাদ্যসংকট কেন তীব্র হতে পারে
পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হলো সার উৎপাদন। আধুনিক কৃষি উৎপাদন বাড়াতে রাসায়নিক সারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যেসব দেশে জমির পরিমাণ কম কিন্তু জনসংখ্যা বেশি, সেখানে প্রতি একর জমি থেকে বেশি ফসল পেতে সার ব্যবহার অপরিহার্য।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্ববাজারে সারের দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তে পারে। এর সঙ্গে সেচ, কৃষিযন্ত্র ও পরিবহনে ব্যবহৃত জ্বালানির মূল্যও যোগ হবে।
ফলে কৃষককে একই সময়ে কয়েক ধরনের বাড়তি ব্যয় বহন করতে হবে। জমি প্রস্তুত করা, পানি তোলা, সার প্রয়োগ, ফসল কাটা এবং বাজারে পণ্য পৌঁছানো—প্রতিটি পর্যায়ে খরচ বাড়তে পারে।
উন্নত দেশের কৃষকরা অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষিবিমা ও মূল্যসহায়তা পান। নিম্ন আয়ের দেশের ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য এসব সুবিধা সীমিত। তাই সারের দাম বাড়লে তারা ব্যবহার কমিয়ে দিতে বাধ্য হতে পারেন।
সারের ব্যবহার সামান্য কমলেও ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে আগে থেকেই প্রয়োজনের তুলনায় কম সার ব্যবহার করা হয়। এতে খাদ্য উৎপাদন কমার আশঙ্কা তৈরি হবে।
কিন্তু খাদ্যের দাম বাড়ার জন্য ফসল ঘরে ওঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না। বড় ব্যবসায়ী ও বাজার নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য ঘাটতির খবর পেলেই আগাম দাম বাড়াতে পারে। অর্থাৎ বাস্তবে খাদ্যসংকট শুরুর আগেই বাজারে মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে।
এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন ও স্থির আয়ের পরিবার। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য কিনতেই ব্যয় হয়। খাদ্যের দাম বাড়লে চিকিৎসা, শিক্ষা, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাতে হয়।
ছয় হাজারের বেশি পণ্যে পড়তে পারে প্রভাব
জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাব শুধু গাড়ির তেল, বিদ্যুৎ বা রান্নার গ্যাসে সীমাবদ্ধ নয়। ৬,০০০টির বেশি পণ্য জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পাওয়া উপাদান অথবা প্রক্রিয়াজাত উপজাতের ওপর নির্ভরশীল।
এসব উপাদানের মধ্যে রয়েছে হিলিয়াম, সালফার, মিথানল, পলিথিন ও পলিপ্রোপিলিন। এগুলো ব্যবহার করে প্লাস্টিক, যন্ত্রের তেল, মোম, আলকাতরা, রাস্তার পিচ, কৃত্রিম কাপড় এবং বিভিন্ন ধরনের শিল্পপণ্য তৈরি হয়।
স্বাস্থ্য খাতও এই সরবরাহব্যবস্থার বাইরে নয়। চৌম্বক অনুরণন চিত্রায়ণ যন্ত্র এবং হৃদ্যন্ত্রের ছন্দ নিয়ন্ত্রকের মতো জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতেও পেট্রোলিয়ামজাত ও সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক উপাদান প্রয়োজন।
এর অর্থ হলো, উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত দীর্ঘ হলে এর প্রভাব হাসপাতাল, ওষুধশিল্প, পোশাক, নির্মাণ, যোগাযোগ, প্যাকেটজাতকরণ ও দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অনেকে মনে করেন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য শক্তিতে চলে গেলে এই নির্ভরতা দ্রুত কমে যাবে। বাস্তবতা আরও জটিল। বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার জন্যও বিশেষ ধরনের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের প্রয়োজন হয়।
ফলে সবুজ জ্বালানির রূপান্তরও বর্তমান তেলনির্ভর শিল্পব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়।
কেন এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো বেশি ঝুঁকিতে
যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে এশিয়া ও আফ্রিকার নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ওপর। এসব দেশের অনেকেই জ্বালানি, সার, রাসায়নিক কাঁচামাল ও শিল্পপণ্যের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
শুধু আমদানিই নয়, অনেক দেশের রপ্তানি বাণিজ্যও মধ্যপ্রাচ্যের বাজার ও সমুদ্রপথের সঙ্গে যুক্ত। তাই জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে তাদের আমদানি ব্যয় বাড়ে, আবার বাণিজ্যপথে বাধা তৈরি হলে রপ্তানি আয়ও কমে যেতে পারে।
এই দেশগুলোর দুর্বলতা আরও বেড়েছে কারণ তারা এখনো সাম্প্রতিক কয়েকটি বৈশ্বিক সংকটের ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। করোনা মহামারি তাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও সরকারি অর্থব্যবস্থায় বড় চাপ সৃষ্টি করেছিল।
এরপর রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ফলে খাদ্য ও জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বড় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়ালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ গ্রহণের ব্যয়ও বেড়ে যায়।
ফলে অনেক দেশ এখন এমন এক অবস্থায় আছে, যেখানে নতুন সংকট মোকাবিলার জন্য তাদের আর্থিক সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। সরকারি ভর্তুকি বাড়ালে বাজেট ঘাটতি বাড়ে, ঋণ নিলে সুদের চাপ বাড়ে, আবার ভর্তুকি না দিলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যায়।
বৈশ্বিক আয়বৈষম্য আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চীন ও ভারত বাদ দিলে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান ২০২৮ সালের পরও মহামারির আগের অবস্থায় ফিরবে না।
এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, বর্তমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব একটি সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে উন্নয়নের ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
উন্নত দেশগুলো নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ, জ্বালানি ভর্তুকি, কৌশলগত মজুত এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে সংকট সামাল দিতে পারছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একই সময়ে ঋণ পরিশোধ, খাদ্য আমদানি, জ্বালানি কেনা এবং জনকল্যাণমূলক ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশের জন্য এর ফল হতে পারে একটি হারানো দশক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান তৈরির জন্য যে অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা, তার বড় অংশ জ্বালানি আমদানি এবং ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যেতে পারে।
যেসব দেশ ইতোমধ্যে ঋণসংকটে রয়েছে, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত কমবে। স্থানীয় মুদ্রার মান কমে গেলে বিদেশি ঋণ পরিশোধ আরও ব্যয়বহুল হবে। এরপর জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান দ্রুত নেমে যেতে পারে।
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য সতর্কবার্তা
এই সংঘাতের শিক্ষা বাংলাদেশের মতো জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস ও সারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় সরাসরি বেড়ে যেতে পারে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহনের খরচ বাড়ায় না। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ, শিল্পকারখানা, নির্মাণ এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়। ব্যবসায়ীরা এই বাড়তি ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করেন। ফলে সাধারণ মূল্যস্ফীতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সারের দাম বাড়লে সরকারকে হয় ভর্তুকি বাড়াতে হবে, নয়তো কৃষকদের বেশি দামে সার কিনতে হবে। ভর্তুকি বাড়ানো হলে সরকারি বাজেটে চাপ পড়বে। কৃষকের ওপর ব্যয় চাপানো হলে খাদ্য উৎপাদন ও বাজারদর উভয়ই প্রভাবিত হতে পারে।
এ কারণে শুধু স্বল্পমেয়াদি মূল্য নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়। জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য, কৌশলগত মজুত, নবায়নযোগ্য শক্তি, দক্ষ সেচব্যবস্থা, স্থানীয় সার উৎপাদন এবং বিকল্প বাণিজ্যপথ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও অর্থনীতির সম্পর্ক
আন্তর্জাতিক অর্থনীতির এই বিভাজন শুধু আর্থিক সমস্যা নয়; এর বড় রাজনৈতিক পরিণতিও রয়েছে। একটি দেশের ভেতরে আয়বৈষম্য বেড়ে গেলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। একইভাবে দেশগুলোর মধ্যকার বৈষম্য বাড়লেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।
দরিদ্র দেশগুলো যদি বারবার বৈশ্বিক সংকটের খরচ বহন করে অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ না পায়, তাহলে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি তাদের আস্থা কমে যেতে পারে। তারা বিকল্প বাণিজ্যজোট, নতুন মুদ্রাব্যবস্থা এবং ভিন্ন রাজনৈতিক অংশীদার খুঁজতে পারে।
এতে বিশ্ব অর্থনীতি আরও বিভক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে থাকবে প্রযুক্তি, পুঁজি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় শক্তিশালী দেশগুলো। অন্যদিকে থাকবে উচ্চ ঋণ, খাদ্যঝুঁকি ও আমদানিনির্ভরতায় আটকে থাকা অর্থনীতিগুলো।
ইরান যুদ্ধের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখে স্বস্তি পাওয়ার যথেষ্ট কারণ নেই। পুঁজিবাজারের উত্থান, তেলের দাম কিছুটা কমে আসা কিংবা সাময়িক যুদ্ধবিরতি সংকটের গভীরতাকে আড়াল করতে পারে।
প্রকৃত ঝুঁকি জমছে জ্বালানি মজুতের পতন, শোধনাগারের ক্ষতি, সারের মূল্যবৃদ্ধি, খাদ্য উৎপাদনের অনিশ্চয়তা, শিল্পের কাঁচামাল ঘাটতি এবং উন্নয়নশীল দেশের ঋণের চাপে।
ধনী দেশগুলো হয়তো সরকারি অর্থ, কৌশলগত মজুত ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিতে পারবে। কিন্তু দরিদ্র দেশগুলোর জন্য একই যুদ্ধের মূল্য হবে অনেক বেশি এবং দীর্ঘস্থায়ী।
আর্থিক বাজার কিছু সময়ের জন্য এই বৈষম্য উপেক্ষা করতে পারে। কিন্তু খাদ্যের দাম, কর্মসংস্থান, ঋণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বকেই মোকাবিলা করতে হবে।

