যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত সবসময়ই বড় রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রশ্ন তৈরি করেছে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ইরানকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নতুন করে সেই পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও এমন একটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে, যেখান থেকে বের হওয়া সহজ হবে না?
একসময় যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু বর্তমানে তাঁর প্রশাসনের অবস্থান অনেকটাই ভিন্ন। সামরিক শক্তি এখন কূটনৈতিক চাপ তৈরির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার হুমকি বারবার সামনে আসছে, আর এর ফলে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে—এই সংঘাত কি ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে পরিণত হবে?
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তি ব্যবহার করা একটি দেশের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলোর একটি। কারণ একটি হামলা শুধু প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, আন্তর্জাতিক আইন, অর্থনৈতিক চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিণতি।
বর্তমান ইরান সংকট সেই জটিল বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
যুদ্ধকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর অধিকারী। কিন্তু সেই শক্তি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত সবসময় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নেওয়া হয়। কারণ সামরিক অভিযানের ফলাফল শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে ইতোমধ্যে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া সংঘাত এবং পরবর্তী হামলা-পাল্টা হামলায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, যুদ্ধের ভয়াবহতা অনেক সময় রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে স্বাভাবিক একটি বিষয় হয়ে যায়। যখন একটি দেশের নেতা সহজভাবে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক হামলার কথা বলেন, তখন সামরিক শক্তি ব্যবহারের নৈতিক সীমা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সামরিক শক্তি সাধারণত শেষ বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের কথা। কিন্তু ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্যে সেই সতর্কতার জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে সমালোচনা রয়েছে।
ইরানের অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি কতটা উদ্বেগজনক?
ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যেমন সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার কথা বলেছেন। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা করা হলে তা যুদ্ধ আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যুদ্ধের সময় সামরিক লক্ষ্যবস্তু এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় স্থাপনার মধ্যে পার্থক্য রাখা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি।
সমালোচকদের প্রশ্ন হলো, যদি রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অবকাঠামোতে হামলা করলে আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দা হয়, তাহলে একই ধরনের পদক্ষেপ অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হবে কীভাবে?
এই দ্বৈত মানদণ্ডের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রয়েছে। তবে আইনগত ও নৈতিক দিক থেকে মূল বিষয় হলো—যে কোনো সামরিক অভিযানে বেসামরিক মানুষের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমানো।
যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি বনাম বাস্তবতার পরীক্ষা
যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক দশকে বহু সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে। ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন সংঘাতে ওয়াশিংটন তার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
কিন্তু এসব যুদ্ধ দেখিয়েছে, সামরিক শক্তি দিয়ে সব রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান করা যায় না।
আফগানিস্তানের যুদ্ধ এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট সেখানে অবস্থান করলেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া স্থায়ী সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
‘দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ’ ধারণাটি মূলত আফগানিস্তান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকেই জনপ্রিয় হয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও সামরিক সক্ষমতা একটি সীমার মুখোমুখি হয়েছিল।
ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। কারণ ইরান কোনো বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়; এটি একটি রাষ্ট্র, যার রয়েছে সামরিক কাঠামো, আঞ্চলিক প্রভাব এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা।
ইরান কি সহজে ভেঙে পড়বে?
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বহুবার সামরিক চাপ প্রয়োগ করেছে। গত এক বছরে লক্ষ্যভিত্তিক হামলায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষতি হয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদন এসেছে।
তবে এসব আঘাতের পরও ইরান তার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এখানেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। একটি দেশের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কিন্তু সেই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করা অনেক কঠিন।
ইতিহাসে দেখা গেছে, বাইরের সামরিক চাপ অনেক সময় কোনো সরকারের পতনের পরিবর্তে উল্টো জাতীয়তাবাদী সমর্থন বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইরানের কট্টরপন্থী নেতৃত্বও সংঘাতকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে পারে। বাইরের আক্রমণের মুখে অনেক নাগরিক রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে একত্রিত হতে পারেন।
যুদ্ধের লক্ষ্য কি পরিষ্কার?
একটি সফল সামরিক অভিযানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্পষ্ট লক্ষ্য।
কিন্তু ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ঠিক কী—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যদি লক্ষ্য হয় ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সীমিত করা, তাহলে সামরিক হামলা কতদিন কার্যকর থাকবে?
যদি লক্ষ্য হয় বর্তমান সরকারকে দুর্বল করা, তাহলে পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে?
যদি সরকার পরিবর্তন হয়, তাহলে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা কে গঠন করবে?
এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়া সামরিক অভিযান শুরু করলে পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে চাপ প্রয়োগ করছে, কিন্তু পরবর্তী দিনের পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়। আর যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, কিন্তু শেষ করার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
যুদ্ধের খরচ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়
ইরান সংকটের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্ব জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
তেলের দাম একটি বড় নিয়ামক। মধ্যপ্রাচ্যে বড় সংঘাত হলে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি মূল্য বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এটি রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে এবং সরকারের জনপ্রিয়তা কমতে পারে।
বর্তমানে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাও চাপের মধ্যে রয়েছে বলে বিশ্লেষণ রয়েছে। ৮০ বছর বয়সী দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর জন্য রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় ইরান যুদ্ধের প্রভাব অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পড়তে পারে।
ইরান যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্রের আরেক আফগানিস্তান হতে পারে?
ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। ইরান একটি বৃহৎ রাষ্ট্র, যার রয়েছে শক্তিশালী সামরিক কাঠামো, উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক মিত্র।
তাই ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শুরু হলে তা আফগানিস্তানের চেয়েও ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র মূলত একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সংঘাত হবে একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে।
এ কারণে সামরিক বিজয় এবং রাজনৈতিক সাফল্যের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকবে।
একটি দেশকে আঘাত করা এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
বিশ্ব শক্তিগুলোর জন্য কী বার্তা যাচ্ছে?
ইরান সংকট শুধু ওয়াশিংটন ও তেহরানের বিষয় নয়। এর দিকে নজর রাখছে রাশিয়া, চীন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি।
যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্রুত লক্ষ্য অর্জন করতে না পারে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো এটিকে আমেরিকান শক্তির সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত সামরিক শক্তি ব্যবহার করে এবং দীর্ঘ সংঘাতে আটকে যায়, তাহলে বিশ্ব রাজনীতিতে তার প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
একটি দেশের সামরিক শক্তি শুধু অস্ত্রের সংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। রাজনৈতিক ধৈর্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দুটি বিষয় সীমিত করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ
ইরান সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে দুটি বড় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
প্রথমটি হলো তেলের বাজার।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ সংকটে পড়লে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। এটি যুক্তরাষ্ট্রসহ সব দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করবে।
দ্বিতীয়টি হলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি।
জনগণের সমর্থন কমে গেলে দীর্ঘ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতের অনেক যুদ্ধেই দেখা গেছে, সামরিক শক্তির চেয়ে জনসমর্থনের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
ইরান নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছে। একদিকে তিনি শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানকে চাপের মধ্যে রাখতে চাইছেন। অন্যদিকে, এমন পদক্ষেপের ঝুঁকি হলো—একটি সীমিত অভিযান ধীরে ধীরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু যুদ্ধের শেষ কোথায় হবে, সেটি নির্ধারণ করা সবচেয়ে কঠিন।
ইরান সংকটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্র কতটা শক্তিশালী, সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো—এই শক্তি ব্যবহারের পরিণতি মোকাবিলা করার মতো রাজনৈতিক ধৈর্য, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের আছে কি না।
কারণ কোনো যুদ্ধ যদি সহজ সিদ্ধান্ত দিয়ে শুরু হয়, প্রতিপক্ষও ধরে নিতে পারে—সেই যুদ্ধের প্রতি প্রতিশ্রুতিও হয়তো ততটা গভীর নয়। আর সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকি।

