যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ডে জন্ম নেওয়া শাফিলিয়া আহমেদের চোখে ছিল ভবিষ্যতের নানা স্বপ্ন। অন্য কিশোরীদের মতোই তারও ছিল পড়াশোনা, বন্ধুত্ব আর নিজের পছন্দের জীবন গড়ার পরিকল্পনা। তার সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল আইনজীবী হওয়া কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় তার নিজের পরিবার।
১৯৮৬ সালের ১৪ জুলাই জন্মের পর শাফিলিয়ার পরিবার ইংল্যান্ডের চেশায়ারের ওয়ারিংটনে চলে যায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী শিক্ষার্থী। পড়াশোনায় আগ্রহী শাফিলিয়া ভবিষ্যতে আইন নিয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তবে পরিবারের রক্ষণশীল মানসিকতা ও তার নিজের পছন্দের জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ধীরে ধীরে তৈরি হয় সংঘাত।
২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শাফিলিয়ার বাবা ইফতিখার আহমেদ ও মা ফারজানা আহমেদ তাকে ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে পাকিস্তানে নিয়ে যান। পরিবারের পরিকল্পনা ছিল, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বয়সে প্রায় ১০ বছর বড় এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে তার বিয়ে দেওয়া।
নিজের ভবিষ্যৎ ও সিদ্ধান্তের অধিকার রক্ষার জন্য শাফিলিয়া মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিয়ে এড়ানোর চেষ্টায় তিনি ব্লিচ পান করেন। এর ফলে তার শরীরের ভেতরের অঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে যুক্তরাজ্যে ফিরিয়ে আনা হয়। সেখানেও চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এমনকি নিজের ১৭তম জন্মদিনও তাকে হাসপাতালের শয্যায় কাটাতে হয়।
চিকিৎসার পর শাফিলিয়া আবার পড়াশোনায় ফেরার চেষ্টা করেন। তিনি প্রিস্টলি কলেজে ভর্তি হন এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে তার মতবিরোধ আরও গভীর হতে থাকে।
২০০৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পোশাক নিয়ে বিরোধের জেরে বাবা-মায়ের সঙ্গে তার তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। পশ্চিমা সংস্কৃতির পোশাক পরার কারণে তাকে পরিবারের জন্য অসম্মানের কারণ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। এরপরই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। অভিযোগ অনুযায়ী, ছোট ভাই-বোনদের সামনে বাবা-মা তাকে নির্যাতন করেন এবং তার মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ গাড়িতে করে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর দীর্ঘ সাত বছর ধরে সত্য গোপন ছিল। শাফিলিয়ার বাবা-মা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। একই সঙ্গে পরিবারের অন্য সন্তানদেরও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ভয় দেখানো হয়েছিল বলে পরে জানা যায়। অবশেষে ২০১০ সালের আগস্টে শাফিলিয়ার ছোট বোন সাহস করে পুলিশের কাছে ঘটনার বিস্তারিত জানান। তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই তদন্ত নতুন গতি পায় এবং মামলার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে।
২০১২ সালের ৩ আগস্ট যুক্তরাজ্যের একটি আদালত ইফতিখার আহমেদ ও ফারজানা আহমেদকে শাফিলিয়া আহমেদের হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত তাদের প্রত্যেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে অন্তত ২৫ বছর কারাভোগের নির্দেশ দেওয়া হয়।
শাফিলিয়া আহমেদের ঘটনা যুক্তরাজ্যে তথাকথিত ‘সম্মান রক্ষার নামে হত্যা’ বা ‘অনার কিলিং’-এর অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হয়ে আছে। তার মৃত্যুর ঘটনা পরিবার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, জোরপূর্বক বিয়ে এবং নারীর অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা তৈরি করেছে।

