গণিতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা হিসেবে পরিচিত ফিল্ডস মেডেলে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে দুই চীনা গণিতবিদের সাফল্য নতুন ইতিহাস গড়েছে। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত দুটি জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে এ সম্মান অর্জন করেছেন হং ওয়াং ও ইউ দেং। চীনের বিজ্ঞান ও গবেষণা অঙ্গনে এ অর্জনকে যুগান্তকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এবারের ফিল্ডস মেডেল পেয়েছেন চীনের হং ওয়াং ও ইউ দেং, যুক্তরাষ্ট্রের জন পারডন এবং কানাডার জেকন সিমারম্যান। প্রতি চার বছর অন্তর ৪০ বছরের কম বয়সী অসাধারণ অবদান রাখা গণিতবিদদের এই আন্তর্জাতিক সম্মাননা দেওয়া হয়। গণিতে অসামান্য অবদানের জন্য ফিল্ডস মেডেলকে অনেকেই ‘গণিতের নোবেল’ হিসেবে অভিহিত করেন।
এবারের চার বিজয়ীর প্রত্যেককে ১৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার অর্থ পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে।
চীনের গুয়াংশি অঞ্চলের গুইলিনে ১৯৯১ সালে জন্ম নেওয়া হং ওয়াং অল্প বয়সেই মেধার স্বাক্ষর রাখেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। শুরুতে ভূ-বিজ্ঞান বিভাগে পড়লেও পরে গণিতে চলে আসেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সে গিয়ে প্যারিস-সুড বিশ্ববিদ্যালয় ও একোল পলিটেকনিকে পড়াশোনা করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট ডেস হাউটস এটিউডস সায়েন্টিফিকসে অধ্যাপনা করছেন।
ফিল্ডস মেডেলের ইতিহাসে হং ওয়াং তৃতীয় নারী হিসেবে এই সম্মাননা অর্জন করলেন।
হং ওয়াং তাঁর সহগবেষক জশ জাহলের সঙ্গে মিলে ১৯১৭ সালে জাপানি গণিতবিদ সোইচি কাকেয়া উত্থাপিত একটি বিখ্যাত জ্যামিতিক সমস্যার সমাধান করেন। প্রশ্নটি ছিল, একটি পেন্সিলকে সমতলে সম্পূর্ণভাবে ঘোরাতে সর্বনিম্ন কতটুকু জায়গার প্রয়োজন। দীর্ঘ এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এই সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান পাওয়া যায়নি। ওয়াং ও তাঁর সহকর্মী সমস্যাটিকে ত্রিমাত্রিক পরিসরে বিশ্লেষণ করে নতুন সমাধান উপস্থাপন করেন এবং গত বছর এ বিষয়ে তাঁদের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।
এই অসাধারণ সাফল্যের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাঁখো ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে হং ওয়াংকে অভিনন্দন জানান। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, হং ওয়াং ফ্রান্সের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার উৎকর্ষের একটি উজ্জ্বল প্রতীক। একই সঙ্গে বিশ্বের গবেষকদের ফ্রান্সে গবেষণা করার আহ্বানও জানান তিনি।
অন্যদিকে ইউ দেংও ছাত্রজীবন থেকেই আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে সাফল্যের জন্য পরিচিত ছিলেন। ২০০৭ সালে তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও দুই বছর পর ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে স্থানান্তরিত হন। পরবর্তীতে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
৩৭ বছর বয়সী ইউ দেং তাঁর গবেষণায় সমাধান করেছেন গণিতের আরেকটি ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ। ১৯০০ সালে জার্মান গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট যে ‘হিলবার্টের ষষ্ঠ সমস্যা’ উত্থাপন করেছিলেন, সেটিই ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়। এই সমস্যায় একক কণার গতিবিধির ভিত্তিতে একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থার আচরণ ব্যাখ্যা করার তাত্ত্বিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। ইউ দেং গ্যাসের কণার আচরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই জটিল সমস্যার কার্যকর সমাধান উপস্থাপন করেন।
একসঙ্গে দুই চীনা গণিতবিদের এই ঐতিহাসিক সাফল্য দেশজুড়ে ব্যাপক উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছে। ওয়েইবো ও রেডনোটসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ফিল্ডস মেডেল’ এবং ‘প্রথম চীনা ফিল্ডস মেডেলজয়ী গণিতবিদ’ বিষয়ক পোস্ট ও ভিডিও ইতোমধ্যে কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
চীনা বংশোদ্ভূত এবং ফিল্ডস মেডেলজয়ী খ্যাতিমান গণিতবিদ শিং-তুং ইয়াও এই অর্জনকে চীনের গণিত গবেষণার জন্য বহু প্রতীক্ষিত এক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এই সাফল্য শুধু দুই গবেষকের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের গণিত গবেষণার ক্রমবর্ধমান শক্তিরও প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৌলিক বিজ্ঞান, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগের যে কৌশল চীন অনুসরণ করছে, ফিল্ডস মেডেলে এই যুগান্তকারী সাফল্য তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল। এটি ভবিষ্যতে দেশটির তরুণ গবেষকদের আরও বড় বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের পথে অনুপ্রাণিত করবে বলেও মনে করছেন তারা।

