ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় একের পর এক প্রশ্ন ও বিতর্কের মধ্যে অবশেষে পদত্যাগ করলেন দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। দীর্ঘদিন ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ এবং সরকারের জবাবদিহি নিয়ে তীব্র চাপের মুখে শনিবার (২৫ জুলাই ২০২৬) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ শুধু একজন মন্ত্রীর বিদায় নয়, বরং ভারতের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের আস্থা এবং সরকারের দায়বদ্ধতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষা নিটকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং তরুণদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করে। সেই ক্ষোভ ধীরে ধীরে রূপ নেয় বড় ধরনের আন্দোলনে। শেষ পর্যন্ত সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবির একটি, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, বাস্তবে পরিণত হলো।
পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, গত ১০ দিনের ঘটনাপ্রবাহ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। তবে বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি বা সম্মানের নয়, বরং দেশের শিক্ষার্থী ও তরুণদের ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি এবং তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি তাঁর আস্থা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ এবং উন্নত ভারতের নির্মাতা।
তিনি আরও বলেন, তরুণদের শক্তি যেন বিভ্রান্তি বা ভুল পথে পরিচালিত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে দেশের ঐক্য বজায় রাখা এবং কোনো শিক্ষার্থী যেন অপ্রয়োজনীয় আইনি জটিলতায় না পড়ে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েই তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিদায়ী শিক্ষামন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, মন্ত্রিসভার সহকর্মী এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, দেশের সেবা করাই তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য ছিল এবং ভবিষ্যতেও ওডিশার জনগণ ও দেশের তরুণদের কল্যাণে কাজ করে যাবেন।ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে শিক্ষার্থীদের ধারাবাহিক আন্দোলন।
গত জুনের শুরু থেকেই ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। শুরুতে সীমিত পরিসরে থাকলেও পরে এটি বড় আকার ধারণ করে। গত ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবী জড়ো হয়ে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার ঘোষণা দেন।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নিট পরীক্ষায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
আন্দোলন শুধু দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মুম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং সংহতি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে উত্তেজনাও তৈরি হয়। কয়েকটি ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের আটক করা হয়।
আয়োজকদের দাবি ছিল, এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম বড় ছাত্র-যুব আন্দোলন। তাদের মতে, এটি শুধু একটি পরীক্ষার অনিয়মের প্রতিবাদ নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনার আন্দোলন।
ভারতের চিকিৎসা শিক্ষায় ভর্তি হওয়ার জন্য নিট অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফলে এই পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব পড়ে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর।
সাম্প্রতিক নিট পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, নম্বর বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।
অভিযোগগুলোর তদন্তে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাগুলো কাজ শুরু করে এবং বিষয়টি আদালতের নজরেও আসে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, এত বড় একটি জাতীয় পরীক্ষায় অনিয়মের দায় শুধু কয়েকজন ব্যক্তির নয়, বরং পুরো ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিফলন।
গত ২১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, সরকারি পরীক্ষার পবিত্রতা নষ্টকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বলেন, যারা এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের সংসদীয় বৈঠকের পর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেন শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুক।শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। তাঁর এই কর্মসূচি দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ এবং বিভিন্ন মহলের আহ্বানের পর তাঁর অনশন ভাঙার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
সোনম ওয়াংচুকের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও ব্যাপক জনসমর্থন এনে দেয়। অনেকেই এটিকে শুধু পরীক্ষার অনিয়মের প্রতিবাদ নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেন।
আন্দোলন যত তীব্র হয়েছে, ততই বিষয়টি রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। ভারতের বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দল শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানায় এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তবে কেন্দ্রীয় সরকার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, নিট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, কয়েকজনের অপরাধের কারণে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উচিত নয়। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, শুধু অপরাধীদের শাস্তি নয়, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা বন্ধ করার জন্য পরীক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।একদিকে এটি দেখাচ্ছে, বড় ধরনের জনঅসন্তোষ এবং শিক্ষার্থীদের চাপ সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে। অন্যদিকে এটি প্রশ্ন তুলছে, দেশের কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ নির্ভর করা পরীক্ষাগুলো কতটা নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য।
শিক্ষার্থীদের কাছে পরীক্ষার ফল শুধু একটি সংখ্যা নয়, এটি তাদের ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেয়। তাই সেই ব্যবস্থায় সামান্য অনিয়মও বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিদায়ের পর এখন মূল প্রশ্ন, শুধু একজন মন্ত্রীর পরিবর্তন কি সমস্যার সমাধান করবে, নাকি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রয়োজন হবে আরও গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের?
কারণ নিট বিতর্ক যে বার্তা দিয়েছে, তা হলো—শিক্ষার্থীদের আস্থা হারালে কোনো শিক্ষা ব্যবস্থাই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।

