ভারতে প্রশ্নফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। বিরোধী কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা সোনিয়া গান্ধী এক দীর্ঘ নিবন্ধে দাবি করেছেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মূল কারণ সরকারের দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা। তাঁর মতে, বর্তমান সংকট কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং শিক্ষা খাতে অব্যাহত অব্যবস্থাপনা, জবাবদিহির অভাব এবং কর্মসংস্থানের সংকট মিলেই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
সোনিয়া গান্ধী অভিযোগ করেন, শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংলাপে না গিয়ে সরকার বলপ্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। তাঁর দাবি, ২০ জুলাই দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি অভিযান সরকারের অসহিষ্ণু মনোভাবেরই প্রতিফলন। তিনি বলেন, কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
শিক্ষার্থীদের ‘প্রতিপক্ষ’ হিসেবে দেখার অভিযোগ
নিবন্ধে সোনিয়া গান্ধী লিখেছেন, সরকারের উচিত ছিল শিক্ষার্থীদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া। কিন্তু তার পরিবর্তে তাদের সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে এবং আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যারা ভবিষ্যতে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, তাদের সমস্যার সমাধান না করে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ কমানোর অভিযোগ
সোনিয়া গান্ধীর অন্যতম বড় অভিযোগ শিক্ষা বাজেটকে ঘিরে। তিনি দাবি করেন, গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় সরকার স্কুল শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য মানসম্মত শিক্ষা আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
তাঁর মতে, সরকারি শিক্ষার সুযোগ কমে যাওয়ায় পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে বেসরকারি শিক্ষা ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ বহুগুণে বেড়েছে।
প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা
ভারতের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা ব্যবস্থারও কঠোর সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেত্রী। তাঁর দাবি, অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা পরীক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, গত ১২ বছরে ১৫২টি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে এবং ২০১৭ সালে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) প্রতিষ্ঠার পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। তাঁর মতে, পরীক্ষা পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে।
কর্মসংস্থান সংকটও বড় কারণ
সোনিয়া গান্ধী মনে করেন, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের পেছনে শুধু প্রশ্নফাঁস নয়, চাকরির বাজারের অনিশ্চয়তাও বড় ভূমিকা রেখেছে।
তিনি দাবি করেন, উচ্চশিক্ষা শেষ করার পরও বিপুলসংখ্যক তরুণ মানসম্মত চাকরি পাচ্ছেন না। তাঁর ভাষায়, শিক্ষা শেষ করার পর ভবিষ্যৎ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, সেটিও তরুণদের হতাশার অন্যতম কারণ।
জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়েও প্রশ্ন
নিবন্ধে তিনি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, পর্যাপ্ত জাতীয় আলোচনা বা সংসদীয় বিতর্ক ছাড়াই এই নীতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, শিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থাগুলোর জবাবদিহি যথেষ্ট নয়।
সরকারের প্রতি আহ্বান
সোনিয়া গান্ধীর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নয়, বরং তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা, সরকারি শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানমুখী নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে, সোনিয়া গান্ধীর এই নিবন্ধ কেবল শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন নয়, বরং মোদি সরকারের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান নীতির বিরুদ্ধে বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান ভিন্ন। সরকার বরাবরই দাবি করে আসছে, শিক্ষা খাতে সংস্কার, প্রশ্নফাঁস রোধ এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ভারতের চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলন এখন শুধু প্রশ্নফাঁসের ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান, সরকারি নীতি এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিকে ঘিরে একটি বৃহত্তর জাতীয় বিতর্কে রূপ নিয়েছে। আগামী দিনে সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার অগ্রগতি এবং গৃহীত নীতিগত সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে এই সংকট কোন পথে এগোবে।

