ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে নিজেদের আন্দোলনের বড় একটি লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বলে মনে করছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তবে এটিকে শেষ নয়, বরং দীর্ঘ পথচলার সূচনা হিসেবে দেখছেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
তার ভাষায়, ‘এটা কেবল শুরু। ককরোচ জনতা পার্টিকে আরও অনেক দূর যেতে হবে।’
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহের টানা আন্দোলনের পর ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এরপর বিক্ষোভ কর্মসূচি স্থগিত করলেও সিজেপির নেতারা জানিয়েছেন, আপাতত তাদের লক্ষ্য নির্বাচনী রাজনীতি নয়; বরং তরুণদের আন্দোলনকে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া।
রোববার সকালে সংগঠনটির এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ দীপকে বলেন, দীর্ঘ আন্দোলনের পর অবশেষে তিনি কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছেন।
তিনি বলেন, ‘অনেক দিন পর নিজের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পেরেছি। ঘুম থেকে উঠে আজ আর ভাবতে হয়নি, এরপর কী হবে বা সন্ধ্যা পর্যন্ত কী ঘটতে পারে।’
৩৭ দিনের টানা আন্দোলনের অভিজ্ঞতাকে ‘অত্যন্ত কঠিন’ বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার পর আপাতত বড় ধরনের কোনো উদ্বেগ নেই।
ব্যঙ্গ থেকে জাতীয় আন্দোলন
গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে ব্যঙ্গ করে ককরোচ জনতা পার্টির সূচনা করেন অভিজিৎ দীপকে। পরে সেটি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, বেকারত্ব এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিতে তরুণদের জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়।
নিজেদের ‘ককরোচ’ পরিচয়ে হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণ দিল্লির যন্তর-মন্তরে জড়ো হয়ে নিটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভর্তি পরীক্ষায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের বিচার দাবি করেন।
আন্দোলনকারীরা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং কয়েকজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর দায়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভের পর তিনি পদত্যাগ করলে সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ার আশ্বাস দেয়। এরপর আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় সিজেপি।
পদত্যাগের সময় ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে এবং এটি তার কাছে ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রশ্ন নয়।
তিনি বলেন, দেশের ঐক্য অটুট রাখা, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা এবং কোনো শিক্ষার্থী যেন আইনি জটিলতায় না জড়ায়—এসব বিষয় বিবেচনা করেই তিনি দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের সময় জনমতের চাপে পদত্যাগ করা দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এর আগে ২০১৮ সালে ‘মি-টু’ আন্দোলনের সময় যৌন হয়রানির অভিযোগের মুখে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়েন এম জে আকবর।
এখনই রাজনীতিতে নয়
সিজেপির ভবিষ্যৎ এবং এটি রাজনৈতিক দলে রূপ নেবে কি না—এমন প্রশ্নে সংগঠনের মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ভারতের রাজনীতিতে কোনো সম্ভাবনাকেই পুরোপুরি নাকচ করা যায় না।
তবে তিনি জানান, আপাতত তার ব্যক্তিগত অগ্রাধিকার বিশ্রাম নেওয়া এবং পরিবারের কাছে ফেরা।
রাঙ্কা বলেন, ‘এখন আমার সবচেয়ে বড় পরিকল্পনা হলো বাড়ি ফিরে ঘুমানো, কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। গত কয়েক মাস আমি বাড়ির বাইরে ছিলাম। এখন একটু স্বাভাবিক হতে চাই এবং এই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাবতে চাই।’
তার ভাষায়, পুরো আন্দোলনের সাফল্য তাদের সবার জন্যই গর্ব, আনন্দ এবং স্বস্তির মুহূর্ত। এরপর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, সংগঠনের আরেক মুখপাত্র সৌরভ দাস স্পষ্ট করে বলেন, এখনই নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই তাদের।
তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য একেবারে পরিষ্কার—এই আন্দোলনকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। দেশে শত শত রাজনৈতিক দল থাকলেও তরুণদের প্রত্যাশা পূরণে তারা সফল হয়নি।’
সৌরভের মতে, যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তরুণদের স্বার্থ ও দাবিকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য করাই এখন সিজেপির মূল উদ্দেশ্য।
সমর্থক ও সমালোচকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা
আন্দোলনের সফল সমাপ্তির পর পাশে থাকা সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন অভিজিৎ দীপকে।
টাইফয়েড ও জ্বরে আক্রান্ত থাকায় আন্দোলন প্রত্যাহারের দিন যন্তর-মন্তরে উপস্থিত সবাইকে ব্যক্তিগতভাবে ধন্যবাদ জানাতে না পারায় দুঃখও প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘৩৭ দিন ধরে যন্তর-মন্তরে যারা অপেক্ষা করেছেন, দেশের জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি সত্যিই আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।’
শুধু সমর্থকরাই নন, সমালোচকদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন দীপকে। তার মতে, সমালোচনাই তাকে নিজের অবস্থান আরও পর্যালোচনা করতে এবং আন্দোলনের কৌশল উন্নত করতে সাহায্য করেছে।
তার ভাষায়, ‘আমার বিশ্বাস, এ কারণেই আমরা শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করতে পেরেছি।’

