রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধ নতুন করে আরও প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে। হামলায় আহত হয়েছেন আরও বহু মানুষ। আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং দখলকৃত অঞ্চলে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যুদ্ধ এখন আর শুধু সামরিক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নেই—এর বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী কিয়েভসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাশিয়ার রাতভর হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। উত্তরাঞ্চলের চেরনিহিভ শহরের একটি সুপারমার্কেটে ড্রোন হামলায় নয় বছর বয়সী এক শিশুসহ দুইজন প্রাণ হারান। আহত হন আরও ২৫ জন। ব্যস্ত সময়ে জনসমাগমপূর্ণ স্থানে এই হামলার কারণে হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলাকে সাধারণ মানুষের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য, একটি সুপারমার্কেটকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো যুদ্ধের নিয়মের বাইরে গিয়ে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে।
শুধু চেরনিহিভ নয়, পূর্বাঞ্চলের খারকিভেও ড্রোন হামলায় একজন নিহত হন। দক্ষিণাঞ্চলের জাপোরিজিয়ায় বোমা হামলায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। রাজধানী কিয়েভে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি বহুতল ভবনে আগুন ধরে যায় এবং সেখানে অন্তত তিনজন আহত হন। এছাড়া দোনেৎস্ক অঞ্চলের স্লোভিয়ানস্ক শহরে জ্বালানি খাতের প্রতিষ্ঠান নাফতোগেজের দুই কর্মী হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
অন্যদিকে, রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায়ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। মস্কোর দাবি অনুযায়ী, দখলকৃত হরলিভকা শহরে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ অঞ্চলে আরেকটি ড্রোন হামলায় দুই শিশুসহ অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়া এক রাতেই সাতটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৩৬টি ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালায়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ড্রোন ও দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সংঘাতের ধরনও বদলে যাচ্ছে। তুলনামূলক কম খরচে পরিচালিত এসব হামলা দ্রুত এবং বিস্তৃত এলাকায় আঘাত হানতে সক্ষম হওয়ায় বেসামরিক জনগণের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ইউক্রেনে ১,৩৯৬ জন এবং রাশিয়ায় ২৫০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান যুদ্ধের মানবিক মূল্য কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে, তারই একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় দেশই বেসামরিক স্থাপনায় ইচ্ছাকৃত হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে স্বল্পপাল্লার ড্রোন, গাইডেড বোমা এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানিও বাড়ছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটিও কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। কূটনৈতিক অগ্রগতির পরিবর্তে সামরিক তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে পড়েছে। রাশিয়া ইতোমধ্যে তাদের দখলে থাকা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড ধরে রাখার পাশাপাশি আরও এলাকা সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে ইউক্রেনও নিজেদের ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়যুদ্ধে পরিণত হচ্ছে। যতদিন কূটনৈতিক আলোচনায় বাস্তব অগ্রগতি না আসে, ততদিন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রনির্ভর এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। আর সেই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়বে যুদ্ধক্ষে

