কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান প্রতিযোগিতা আরও নতুন মাত্রা পেয়েছে। এবার উন্নত প্রযুক্তির চীনা রোবট আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নেওয়া এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ হিসেবে জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদেশে তৈরি উন্নত রোবট প্রযুক্তি ভবিষ্যতে নজরদারি, তথ্য চুরি এবং সাইবার নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তবে চীন এই সিদ্ধান্তকে প্রযুক্তি ও বাণিজ্য খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে। বেইজিংয়ের অভিযোগ, নিরাপত্তার বিষয়কে সামনে এনে যুক্তরাষ্ট্র মূলত চীনের প্রযুক্তি উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু কয়েকটি রোবট আমদানির ওপর সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে প্রযুক্তিগত আধিপত্যের লড়াইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মার্কিন ফেডারেল যোগাযোগ কমিশন নতুন এই বিধিনিষেধের ঘোষণা দিয়েছে। এর আওতায় উন্নত মানবাকৃতির রোবট, চার পায়ে চলা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র এবং বিভিন্ন ধরনের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর রোবট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এসব রোবটের বড় একটি অংশ চীনে উৎপাদিত হয়। বর্তমানে চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রোবট নির্মাতা দেশ হিসেবে পরিচিত। শিল্প কারখানা, চিকিৎসা সেবা, গৃহস্থালি কাজ এবং জনসেবামূলক বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত রোবট তৈরি করছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভবিষ্যতে তৈরি হওয়া বিদেশি এসব প্রযুক্তিপণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়বে। তবে এর আগে অনুমোদন পাওয়া রোবট বা যন্ত্রপাতি এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে না।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, উন্নত রোবট শুধু সাধারণ কাজের জন্য ব্যবহৃত হয় না; এগুলোর সঙ্গে থাকা সেন্সর, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাদের আশঙ্কা, বিদেশি প্রযুক্তিনির্ভর রোবট ব্যবহার করে—
- নাগরিকদের ওপর নজরদারি চালানো,
- গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা,
- দূর থেকে যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা,
- সরকারি বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় সাইবার আক্রমণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
ফেডারেল যোগাযোগ কমিশনের চেয়ারম্যান ব্রেনডান কার জানিয়েছেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখা এবং বিদেশি প্রযুক্তি নির্ভর ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে শুধু অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম নয়, তথ্য ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট প্রযুক্তির বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ভবিষ্যতের শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং দৈনন্দিন জীবনে রোবটের ব্যবহার আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই খাতে চীন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কম খরচে উন্নত প্রযুক্তির রোবট তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।
চীনের ইউনিট্রি, ইউবিটেক এবং এজিবটের মতো প্রতিষ্ঠান মানবাকৃতির রোবটসহ বিভিন্ন ধরনের স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র তৈরি করছে। এসব রোবট কারখানা, হাসপাতাল, বাড়ি এবং জনসেবামূলক কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও টেসলা এবং বস্টন ডাইনামিকসের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান উন্নত রোবট তৈরিতে কাজ করছে। ফলে এই খাতটি এখন দুই দেশের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাস।চীনের অভিযোগ, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়কে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অযৌক্তিক বাধা তৈরি করছে। বেইজিংয়ের মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করা হলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চীন জানিয়েছে, নিজেদের বৈধ স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। কারণ আধুনিক প্রযুক্তি পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা এখন বৈশ্বিকভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
চীনা রোবট নির্মাতারা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ হারালে তাদের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে বাধা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও সস্তা ও দ্রুত উন্নয়নশীল চীনা প্রযুক্তির বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হবে।
এতে প্রযুক্তি বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে এবং বিভিন্ন দেশ নিজেদের প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত বিরোধ নতুন নয়। এর আগে উন্নত কম্পিউটার চিপ, টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা পদক্ষেপ দেখা গেছে।
এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো রোবট প্রযুক্তি।
ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় রোবটের ভূমিকা যত বাড়বে, এই খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতাও তত তীব্র হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত তাই শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি বিশ্ব প্রযুক্তি ব্যবস্থায় নেতৃত্ব ধরে রাখার লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগামী দিনে কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

