চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সামরিক সংঘাতে জড়াতে প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির সামরিক নেতৃত্বের দাবি, যুদ্ধবিরতির সময়কে সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়ে তারা ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছে এবং সামরিক সক্ষমতা আরও জোরদার করেছে। সূত্র: আল জাজিরা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে এক বিবৃতিতে ইরানের সামনে নতুন একটি চুক্তি অথবা ‘সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ’—এই দুই বিকল্পের কথা উল্লেখ করেন। তবে তেহরানের বক্তব্য, ওমানসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আলোচনা চললেও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির কার্যক্রম কোনোভাবেই থেমে নেই।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক বক্তব্যে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এবং বর্তমানে স্থগিত থাকা সমঝোতা স্মারকের পর যুদ্ধবিরতির প্রতিটি মুহূর্ত তারা সামরিক প্রস্তুতি জোরদারে ব্যবহার করেছেন।
তার ভাষ্য, বিদ্যমান সামরিক সরঞ্জাম পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং নতুন সামরিক সক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, নতুন প্রজন্মের ড্রোন ইতোমধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এসব ড্রোনের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য পরে প্রকাশ করা হবে।
গত মাসে ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে রেজা দাবি করেন, যুদ্ধ চলাকালেও এক দিনের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন বন্ধ হয়নি। তার দাবি, যুদ্ধের আগের সময়ের তুলনায় বর্তমানে ড্রোন উৎপাদন তিন গুণ বেড়েছে। যদিও তিনি উৎপাদনের নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করেননি।
তিনি বলেন, শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের নিহত হওয়ার পরও সশস্ত্র বাহিনী তাদের ঐক্য ধরে রেখেছে এবং নতুন কৌশল ও উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে বিস্মিত করেছে।
ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে আইআরজিসির দাবি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির সময় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনও বাড়ানো হয়েছে। বাহিনীটির মুখপাত্র হোসেন মহিব্বি বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদের সক্ষমতা আরও উন্নত করা হয়েছে।
তবে আইআরজিসি এখনো তাদের মোট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত, দেশীয় উৎপাদন ক্ষমতা কিংবা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।
গত জুনে কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুদ্ধের পরও ইরান তাদের যুদ্ধপূর্ব ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং ড্রোনের প্রায় ৪০ শতাংশ অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এতে তেহরান আরও কয়েক মাস অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
আকাশযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্র কয়েকটি দেশের চালকযুক্ত ও চালকবিহীন বিমান ইরানের আকাশসীমায় হাজার হাজার অভিযান পরিচালনা করেছে। ইরানের দাবি, এসব অভিযানের কিছু বিমান ও ড্রোন তারা শনাক্ত ও ভূপাতিত করেছে।
আইআরজিসি এবং ইরানের সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় তারা একাধিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ-৯ ও এমকিউ-১ নজরদারি ও যুদ্ধ ড্রোন এবং ‘লুকাস’ নামে একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোন ধ্বংস করেছে।
এদিকে গত সপ্তাহে রয়টার্স বেনামী সূত্রের বরাতে জানায়, পাকিস্তান হয়ে চীন থেকে কাঁধে বহনযোগ্য ৪০০টি বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারের প্রথম চালান খুব শিগগিরই ইরানে পৌঁছাতে পারে। তবে চীন ও পাকিস্তান এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
‘আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল সিটি’র দাবি
আইআরজিসির সাবেক জ্যেষ্ঠ কমান্ডার হোসেন কানানি মোকাদ্দম আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারেনি।
তার দাবি, দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ও ওয়ারহেডের ধ্বংসক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটিগুলোতে বিপুল অস্ত্র মজুত রয়েছে এবং সেগুলোর নতুন নতুন অংশ পর্যায়ক্রমে কার্যক্রমে যুক্ত হচ্ছে। তার মতে, এই সক্ষমতার কারণেই ট্রাম্প একাধিকবার ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিমান হামলার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন।
চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করে নতুন চুক্তির সম্ভাবনার কথা জানায়।
উত্তেজনা ছড়াচ্ছে পুরো অঞ্চলে
মার্কিন হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজার ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী মঙ্গলবার দাবি করেছে, ইয়েমেনের সায়াদাহ ও হাজ্জাহ প্রদেশে সৌদি ড্রোনের উপস্থিতির জবাবে তারা সৌদি আরবের নাজরান বিমানবন্দরে সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
একই সময়ে লোহিত সাগরে ইয়েমেনের হোদেইদাহ উপকূল থেকে ১৩ নটিক্যাল মাইল উত্তরে বিস্ফোরকবোঝাই একটি নৌকার আঘাতে ভারতীয় পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ডুবতে শুরু করে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাহাজটির ১৪ জন নাবিককেই নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।
ইরাক সীমান্তসংলগ্ন কুয়েতের একটি এলাকায় রাতের বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ড নিয়েও বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচনা চলছে। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সেখানে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি ড্রোন আঘাত হেনেছে। তবে কুয়েত, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এবং আইআরজিসি—কেউই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
গত সোমবার ওমানের খাসাব থেকে প্রায় ২০ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পূর্বে লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি বাল্কার জাহাজ অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব
জুনের সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর আইআরজিসি হরমুজ প্রণালিতে একাধিক জাহাজকে আঘাত বা ফিরে যেতে বাধ্য করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও কয়েকটি জাহাজ নিরাপদে পারাপারও সম্পন্ন করেছে।
ইরান কিছু জাহাজকে নিজেদের জলসীমার উত্তর দিকের রুট ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। ইরাকের তেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশটির অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলো ওই পথ ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে ওমানের জলসীমা দিয়ে দক্ষিণ রুট ব্যবহার করতে চাওয়া জাহাজগুলোর বিষয়ে ইরান সতর্ক করেছে যে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সেই পথ নিরাপদ নয়।
হোসেন কানানি মোকাদ্দমের দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে এবং অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এমন স্থানে তৈরি হচ্ছে, যা প্রতিপক্ষের ধারণারও বাইরে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি দক্ষিণাঞ্চলের কোনো ইরানি দ্বীপ সাময়িকভাবে দখল করতেও সক্ষম হয়, তবুও সেই অভিযান তাদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে এবং ইরান শেষ পর্যন্ত সেসব এলাকা পুনর্দখল করবে।
তার ভাষায়, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়া সম্ভব নয়।

