বিশ্ব অর্থনীতি এখনও উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এরই মধ্যে নতুন করে খাদ্যের দামে বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতির আশঙ্কার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা। সংস্থাটির প্রধান অর্থনীতিবিদের মতে, ইরান ও ইউক্রেনকে ঘিরে চলমান সংঘাত, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় এবং চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব একসঙ্গে বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক মাসে অনেক দেশে খাদ্যদ্রব্যের মূল্য তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রায় প্রতিটি খাতেই ব্যয় বাড়ছে, যার প্রভাব ধীরে ধীরে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো জানিয়েছেন, বছরের শেষ দিকে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করতে পারে এবং আগামী বছরে সেই ঊর্ধ্বগতি আরও স্পষ্ট হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব সাধারণত তিন থেকে ছয় মাস পর ভোক্তা পর্যায়ে দৃশ্যমান হয়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত প্রভাব এখনো পুরোপুরি বাজারে প্রতিফলিত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, কৃষি উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ব্যয়গুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি, সার, সেচ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংরক্ষণ। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে এসব খাতের ব্যয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে সার উৎপাদন ব্যাহত হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষি উৎপাদনে।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তা কৃষিপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন হওয়ায় সেখানে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বব্যাপী পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার তেল ও গ্যাস অবকাঠামোর ক্ষতির কারণে ডিজেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের আন্তর্জাতিক সরবরাহও চাপে পড়েছে। কৃষি উৎপাদনের জন্য এই দুই উপাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষকেরাও বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের চাপ অনুভব করছেন। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের লাভের পরিমাণ কমে এসেছে। ফলে অনেক কৃষক আগের তুলনায় কম জমিতে চাষ করছেন অথবা কম ব্যয় লাগে এমন ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিল্প সংগঠনের হিসাবে, সরকারি সহায়তা না পেলে দেশটির প্রধান নয়টি কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী কৃষকদের ২০২৭ সালে প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে। এমনকি প্রতি একক জমিতে উৎপাদন ব্যয় সম্ভাব্য আয়ের চেয়ে বেশি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক দেশ অস্ট্রেলিয়াও উৎপাদন কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে। দেশটির মতে, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে চলতি মৌসুমে শীতকালীন ফসলের উৎপাদন ২১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
এদিকে আবহাওয়াজনিত ঝুঁকিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চলতি বছরের এল নিনো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধারা পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কোটি কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ভারতেও বর্ষা মৌসুম বিলম্বিত হয়েছে এবং চলতি মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চাল উৎপাদনকারী এই দেশে উৎপাদন কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দামও নতুন করে চাপের মুখে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর সবচেয়ে বেশি পড়ে। খাদ্য আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচের ঊর্ধ্বগতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ শেষ পর্যন্ত স্থানীয় বাজারেও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও আগামী দিনের খাদ্যবাজার নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, আপাতত বাজারে যে স্বস্তি দেখা যাচ্ছে তা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট এবং বৈরী আবহাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে বছরের শেষ ভাগ থেকে বৈশ্বিক খাদ্যবাজারে নতুন মূল্যচাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।

