যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথকে ঘিরে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে অস্বস্তি ক্রমেই প্রকাশ্যে আসছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির একজন দৃঢ় সমর্থক হিসেবে পরিচিত হেগসেথ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে নিয়ে দলীয় অসন্তোষ শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের সঙ্গে দীর্ঘায়িত যুদ্ধ, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন, গুরুত্বপূর্ণ পদে বিতর্কিত মনোনয়ন, প্রতিরক্ষা ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব—সব মিলিয়ে তাঁর সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন একাধিক রিপাবলিকান নেতা।
৫ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হেগসেথের প্রতি রিপাবলিকানদের অনাস্থার কারণ সবার ক্ষেত্রে এক নয়। কেউ তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে সন্দিহান, কেউ সামরিক নেতৃত্বে তাঁর হস্তক্ষেপে বিরক্ত, আবার কেউ ইরান যুদ্ধের ব্যয় ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। ফলে এটি কোনো একক ইস্যুকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিদ্রোহ নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা বিভিন্ন অভিযোগের সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ।
প্রকাশ্যে কঠোর সমালোচনা থম টিলিসের
হেগসেথের বিরুদ্ধে রিপাবলিকান শিবির থেকে সবচেয়ে সরাসরি বক্তব্য এসেছে সিনেটর থম টিলিসের কাছ থেকে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদপত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হেগসেথের ওপর তাঁর আর কোনো আস্থা নেই।
টিলিসের অভিযোগ, হেগসেথের কর্মকাণ্ডে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে। বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা তাঁর নেই এবং তিনি অতিরিক্ত মাত্রায় সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান। সিনেটরের ভাষ্য অনুযায়ী, হেগসেথের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে, যা তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অধীনস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে।
টিলিস শুধু ব্যক্তিগত মতামতই দেননি; তিনি দাবি করেছেন, পেন্টাগনের ভেতরেও হেগসেথের নেতৃত্বের ওপর আস্থা কমছে। ক্যাপিটল হিলের আইনপ্রণেতারাও সামরিক সদর দপ্তরের ভেতর থেকে একই ধরনের উদ্বেগের কথা শুনছেন বলে তিনি জানান।
এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা নয়। নিজ দলের একজন সিনেটর যখন প্রতিরক্ষা সচিবের ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের ধরন নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন, তখন তা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
ইরান যুদ্ধ হেগসেথের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
হেগসেথকে ঘিরে অসন্তোষ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও এখন পর্যন্ত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো সুস্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না।
যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে। এতে সামরিক ব্যয় বাড়ছে, নতুন অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র আরেকটি অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে কি না—এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
হেগসেথের সমালোচকেরা মনে করছেন, তিনি যুদ্ধের উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সমাপ্তি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিকল্পনা সম্পর্কে যথেষ্ট পরিষ্কার ধারণা দিতে পারেননি। যুদ্ধক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনা করা সামরিক দায়িত্বের অংশ হলেও একটি সংঘাত কীভাবে শেষ হবে, কত অর্থ প্রয়োজন হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর কৌশলগত লাভ কী—এসব প্রশ্নের জবাবও প্রতিরক্ষা নেতৃত্বকে দিতে হয়।
গত জুলাইয়ে ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের সঙ্গে এক শুনানিতে হেগসেথের তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। পিটার্স তাঁকে ব্যর্থ হিসেবে আখ্যা দেন এবং অভিযোগ করেন, বর্তমান প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি অন্তহীন যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
যদিও এই সমালোচনা একজন ডেমোক্র্যাটের কাছ থেকে এসেছে, ইরান যুদ্ধের ব্যয় এবং সময়কাল নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে হেগসেথের সমস্যা শুধু দলীয় বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ নেই; যুদ্ধ পরিচালনার বাস্তব ফলাফল তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকেও দুর্বল করছে।
সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে জেনারেল ক্রিস্টোফার লানেভকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত রিপাবলিকানদের সঙ্গে হেগসেথের সাম্প্রতিক বিরোধের আরেকটি বড় কারণ।
আইওয়া অঙ্গরাজ্যের সিনেটর জোনি আর্নস্টসহ কয়েকজন রিপাবলিকান এই মনোনয়ন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। মনোনয়নটি দ্রুত অনুমোদনের জন্য সর্বসম্মত সমর্থন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দলীয় আপত্তির কারণে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
লানেভকে এপ্রিল মাসে ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান করা হয়েছিল। একই সময়ে হেগসেথ কোনো প্রকাশ্য ব্যাখ্যা ছাড়াই জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে সরিয়ে দেন। লানেভের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালনের জন্য যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে তখন থেকেই প্রশ্ন ছিল।
সিনেটের সশস্ত্র বাহিনীবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকারও লানেভের মনোনয়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। সাধারণভাবে প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে রিপাবলিকানরা প্রশাসনকে শক্ত সমর্থন দিয়ে থাকেন। সেই দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা যখন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নিয়োগের বিরোধিতা করেন, তখন বোঝা যায় সমস্যাটি শুধু ব্যক্তিগত অপছন্দের নয়।
সমালোচকদের আশঙ্কা, হেগসেথ সামরিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সামরিক নেতৃত্বে দ্রুত ও ঘনঘন পরিবর্তন বাহিনীর অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, মনোবল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ক্যারিবীয় অঞ্চলে সামরিক হামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন ক্যারিবীয় সাগরে ছোট নৌযানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার নির্দেশ দেয়। প্রশাসনের দাবি ছিল, এসব নৌযান মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত। তবে হামলার পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ এবং এর আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
রিপাবলিকান সিনেটর রজার উইকার এবং ডেমোক্র্যাট সিনেটর জ্যাক রিড যৌথভাবে হেগসেথের কাছে জানতে চান, কোন আইনের ভিত্তিতে এসব হামলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা আরও জানতে চান, কোন কোন মাদক পাচারকারী বা তথাকথিত সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী সামরিক শক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের কাছ থেকে এ বিষয়ে চাওয়া পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে উদ্বেগের মূল বিষয় শুধু একটি সামরিক অভিযানের সাফল্য বা ব্যর্থতা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা মাদকবিরোধী অভিযানে কতটা ব্যবহার করা যাবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন। যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই অস্পষ্ট পরিচয়ের নৌযানের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো হলে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং সামরিক জবাবদিহি—সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
ভেনেজুয়েলার কাছাকাছি নৌযানে হামলা
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার জলসীমার কাছে বা আশপাশে চলাচলকারী ছোট বেসামরিক নৌযানের ওপর প্রাণঘাতী হামলা শুরু করে। প্রশাসন দাবি করেছিল, এসব নৌযান মাদক পাচার এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
তবে অভিযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। কিছু আইন বিশেষজ্ঞের মতে, এ ধরনের অভিযানে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে।
এসব ঘটনা হেগসেথের নির্দেশ প্রদান এবং সামরিক শক্তি ব্যবহারের নীতিকে নতুন করে আলোচনায় আনে। একজন প্রতিরক্ষা সচিবের দায়িত্ব শুধু শক্তি প্রদর্শন নয়; সামরিক অভিযানের আইনগত বৈধতা, প্রমাণের মান এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা তাঁর দায়িত্বের অংশ।
প্রশাসন যখন তথ্য দিতে অনীহা দেখায়, তখন কংগ্রেসের সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ বাড়া স্বাভাবিক। রিপাবলিকান নেতাদের একাংশের অসন্তোষের পেছনে এই জবাবদিহির ঘাটতিও বড় ভূমিকা রাখছে।
দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট নিয়েও মতবিরোধ
চলতি বছরের মে মাসে সিনেটের প্রতিরক্ষা বরাদ্দবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান মিচ ম্যাককনেল পেন্টাগনের ২০২৭ সালের ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেট প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে আপত্তি জানান।
বিশেষ করে বহুস্তরবিশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘গোল্ডেন ডোম’-এর অর্থায়ন এবং বাজেটের কাঠামো নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল। এই ব্যবস্থা ইসরায়েলের ‘আয়রন ডোম’-এর আদলে তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ম্যাককনেলের আপত্তির একটি বড় কারণ ছিল বাজেটের কিছু অংশ ‘সমন্বয় প্রক্রিয়ার’ মাধ্যমে অনুমোদনের চেষ্টা। এই পদ্ধতিতে সিনেটে সাধারণ ৬০ ভোটের পরিবর্তে ৫১ ভোটে বিল পাস করা সম্ভব।
প্রতিরক্ষা ব্যয়ের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও বিশাল আর্থিক দায় তৈরি করা সিদ্ধান্ত যদি সীমিত আলোচনার মাধ্যমে অনুমোদিত হয়, তবে ভবিষ্যতে এর ব্যয়, কার্যকারিতা এবং তদারকি নিয়ে সমস্যা তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে।
হেগসেথের জন্য এই বিরোধ বিশেষভাবে বিব্রতকর। কারণ প্রতিরক্ষা বাজেট সাধারণত রিপাবলিকানদের শক্ত সমর্থন পায়। কিন্তু দলের প্রবীণ নেতারাই যখন বাজেটের স্বচ্ছতা ও কাঠামো নিয়ে আপত্তি তোলেন, তখন বোঝা যায় প্রশাসন নিজের দলের মধ্যেও প্রয়োজনীয় ঐকমত্য তৈরি করতে পারছে না।
ন্যাটো ও পুরোনো মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব
ম্যাককনেল ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি দিক নিয়েও সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ন্যাটোসহ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করা হলে তাতে প্রতিপক্ষ দেশগুলোই লাভবান হবে।
এই বিতর্ক সরাসরি হেগসেথের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ না হলেও তিনি প্রশাসনের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতির প্রধান বাস্তবায়নকারী। ফলে মিত্রদের সঙ্গে সামরিক সমন্বয়, যৌথ প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা এবং বৈশ্বিক প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হলে তার দায় তাঁর ওপরও পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি শুধু অস্ত্র ও সেনাসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। ইউরোপ, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে মিত্রদেশগুলোর ঘাঁটি, গোয়েন্দা তথ্য, আকাশসীমা, বন্দর ও রাজনৈতিক সমর্থন দেশটির বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মিত্রদের দূরে ঠেলে দিয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা নীতি গড়ে তোলা বাস্তবে কঠিন।
অভিজ্ঞতার ঘাটতি শুরু থেকেই ছিল আলোচনায়
৪৬ বছর বয়সী পিট হেগসেথ আফগানিস্তান ও ইরাকে সামরিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে প্রতিরক্ষা সচিব হওয়ার আগে তিনি বড় কোনো সামরিক সদর দপ্তর, সরকারি মন্ত্রণালয় কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা পরিচালনা করেননি। তিনি মূলত একটি রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমের উপস্থাপক হিসেবে জাতীয়ভাবে পরিচিত হন।
ট্রাম্প নিয়মিত তাঁর অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন এবং সেখান থেকেই দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ২০২৪ সালে হেগসেথকে প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রধান হিসেবে মনোনয়ন দিয়ে ট্রাম্প তাঁকে কঠোর, বুদ্ধিমান এবং ‘আমেরিকা প্রথম’ নীতির প্রকৃত বিশ্বাসী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
হেগসেথের সামরিক অভিজ্ঞতা থাকলেও এত বড় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা না থাকায় তাঁর মনোনয়ন শুরু থেকেই বিতর্কিত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগে বিপুলসংখ্যক সামরিক ও বেসামরিক কর্মী কাজ করেন। এর অধীনে রয়েছে বিশাল বাজেট, অসংখ্য বিদেশি ঘাঁটি, পারমাণবিক অস্ত্রব্যবস্থা এবং বিশ্বজুড়ে চলমান সামরিক কার্যক্রম।
সমালোচকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকা এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। বর্তমান সংকট সেই পুরোনো উদ্বেগকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
সামরিক বাহিনীর ভেতরে আদর্শিক সংঘাত
হেগসেথ দায়িত্ব নেওয়ার পর সামরিক বাহিনীর বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচির কঠোর বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে বাহিনীকে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত করে।
এই অবস্থান তাঁকে সাবেক যৌথ বাহিনী প্রধান চার্লস কিউ ব্রাউনের সঙ্গে সংঘাতে নিয়ে যায়। হেগসেথ অভিযোগ করেছিলেন, ব্রাউন বামপন্থী রাজনীতিকদের উগ্র অবস্থান অনুসরণ করছেন।
ট্রাম্পের মতো হেগসেথও সামরিক বাহিনীর তথাকথিত ‘অতিরিক্ত প্রগতিশীল’ নীতির বিরোধী। তাঁর সমর্থকেরা মনে করেন, তিনি বাহিনীকে আবার যুদ্ধের প্রস্তুতি ও সামরিক শৃঙ্খলার দিকে ফিরিয়ে আনছেন।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, যোগ্য সামরিক কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক বা আদর্শিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সরিয়ে দেওয়া হলে বাহিনীর পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বাধীনভাবে পরামর্শ দেওয়ার আগ্রহ কমে যেতে পারে।
হেগসেথ তাঁর ২০২৪ সালের বইয়ে লিখেছিলেন, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শের কারণে তাঁকে সেনাবাহিনীতে কোণঠাসা করা হয়েছিল। তিনি ২০২১ সালে বাহিনী ছাড়েন এবং বলেন, যে সেনাবাহিনী তাঁকে আর চায়নি, সেই বাহিনীকেও তিনি আর চাননি।
এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর বর্তমান সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে কি না, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।
গোপন সামরিক তথ্য ফাঁসের অভিযোগ
২০২৫ সালের শুরুর দিকে হেগসেথ ইয়েমেনে আসন্ন হামলা সম্পর্কিত গোপন তথ্য বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে সাংবাদিক এবং অনুমোদনহীন ব্যক্তিদের কাছে প্রকাশ করার অভিযোগে সমালোচিত হন।
হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ঘটনাটি অনিচ্ছাকৃতভাবে ঘটেছে। তবে প্রতিরক্ষা বিভাগের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন ভুলকে অনেকেই গুরুতর নিরাপত্তা ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন।
সামরিক অভিযানের সময়, লক্ষ্য এবং পদ্ধতি আগাম প্রকাশিত হলে সেনাদের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। শত্রুপক্ষ প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে এবং অভিযানের কৌশলগত সুবিধা নষ্ট হতে পারে।
এই ঘটনা হেগসেথের বিচারবোধ ও গোপনীয়তা রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে নেতৃত্ব, যুদ্ধ ও সামরিক নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক বাড়ায় পুরোনো ঘটনাটিও আবার সামনে আসছে।
কেন রিপাবলিকানদের অসন্তোষ গুরুত্বপূর্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সচিবদের বিরোধী দলের সমালোচনার মুখে পড়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু নিজ দলের প্রভাবশালী সিনেটররা প্রকাশ্যে অনাস্থা জানালে পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়।
রিপাবলিকানরা হেগসেথের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করছেন না। থম টিলিস তাঁর প্রশাসনিক যোগ্যতা ও নেতৃত্বের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জোনি আর্নস্ট এবং রজার উইকার সামরিক নিয়োগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। মিচ ম্যাককনেল প্রতিরক্ষা বাজেট ও মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যরা ইরান যুদ্ধের সময়কাল, ব্যয় এবং লক্ষ্য নিয়ে অসন্তুষ্ট।
অভিযোগগুলো আলাদা হলেও সবকটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি সাধারণ প্রশ্ন—পিট হেগসেথ কি যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক কাঠামোকে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মাধ্যমে পরিচালনা করতে পারছেন?
ট্রাম্পের সমর্থনই এখন হেগসেথের বড় শক্তি
হেগসেথের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হলেও তিনি এখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত। ট্রাম্প প্রশাসনে ব্যক্তিগত আনুগত্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কংগ্রেসের সমালোচনা বাড়লেই হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়া হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
তবে রিপাবলিকান সিনেটরদের সহযোগিতা ছাড়া সামরিক কর্মকর্তাদের মনোনয়ন অনুমোদন, বাজেট পাস এবং নতুন যুদ্ধের অর্থায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ হেগসেথ পদে থাকলেও তাঁর নীতি বাস্তবায়নের ক্ষমতা ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে যেতে পারে।
ট্রাম্প তাঁকে সমর্থন করে গেলে প্রকাশ্য পদচ্যুতির আশঙ্কা কম থাকবে। কিন্তু পেন্টাগনের কর্মকর্তা এবং রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের আস্থা আরও কমলে প্রশাসনের সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলাবস্থা দেখা দিতে পারে।
সামনে কোন বিষয়গুলো নির্ধারণ করবে হেগসেথের ভবিষ্যৎ
হেগসেথের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রধানত কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। প্রথমত, ইরান যুদ্ধ কত দ্রুত এবং কোন শর্তে শেষ হয়। যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, ক্রিস্টোফার লানেভের মনোনয়ন এবং সামরিক বাহিনীর অন্য শীর্ষ পদগুলো নিয়ে প্রশাসন রিপাবলিকান সিনেটরদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে কি না।
তৃতীয়ত, ২০২৭ সালের ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেট কীভাবে অনুমোদন করা হয় এবং এর ব্যয় কতটা স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়।
চতুর্থত, পেন্টাগনের অভ্যন্তরে হেগসেথের প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার করা যায় কি না। সামরিক কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া শুধু রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে এত বড় প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
পিট হেগসেথকে নিয়ে রিপাবলিকানদের বর্তমান অসন্তোষ কোনো একটি সিদ্ধান্ত বা বিতর্ক থেকে তৈরি হয়নি। দীর্ঘায়িত ইরান যুদ্ধ, সামরিক নেতৃত্বে অস্থিরতা, বিতর্কিত মনোনয়ন, আইনি ব্যাখ্যা ছাড়াই প্রাণঘাতী অভিযান, গোপন তথ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতা এবং বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেটের অস্পষ্ট কাঠামো—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়ছে।
হেগসেথের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আস্থা। তবে শুধু হোয়াইট হাউসের সমর্থন দিয়ে কংগ্রেস, পেন্টাগন এবং সামরিক বাহিনীর অসন্তোষ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হলে কিংবা সামরিক নেতৃত্ব ও বাজেট নিয়ে রিপাবলিকানদের আপত্তি দূর না হলে হেগসেথের অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে। তখন প্রশ্নটি শুধু তিনি পদে থাকবেন কি না, তা নয়; বরং পদে থেকেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতি কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারবেন—সেটিই হয়ে উঠবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

