পশ্চিমবঙ্গে মসজিদের লাউডস্পিকার অপসারণকে ঘিরে চলমান বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিষয়টি এবার ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নজরেও পৌঁছেছে। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে বৈঠক করেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচিত এনসিপিআইয়ের তিন সংখ্যালঘু সাংসদ—আবু তাহের, খলিলুর রহমান ও ইউসুফ পাঠান। বৈঠকে তারা অভিযোগ করেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের নামে পরিচালিত অভিযানে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে বেশি লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে।
সাংসদরা বৈঠকে স্পষ্ট করেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নে তাদের কোনো আপত্তি নেই। তবে তারা চান, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য একই নীতি অনুসরণ করা হোক। তাদের বক্তব্য, যদি শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের নিয়ম কার্যকর করা হয়, তাহলে তা মসজিদের পাশাপাশি দুর্গাপূজা, কালীপূজা এবং অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
বৈঠক শেষে আবু তাহের সাংবাদিকদের বলেন, কোনো একটি ধর্মকে আলাদাভাবে লক্ষ্য করে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে। তাই আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ ওঠার সুযোগ যেন না থাকে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
তিন সাংসদ আরও দাবি করেন, সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে পরিচালিত অভিযানের কারণে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা এই পরিস্থিতির বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অমিত শাহ তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সোমবার রাতে কলকাতার পর্ণশ্রী থানায় কয়েকটি মসজিদ কমিটির প্রতিনিধিদের ডেকে লাউডস্পিকার অপসারণ নিয়ে আলোচনা করা হয়। এরপর কলকাতাসহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ থেকে লাউডস্পিকার খুলে ফেলার ঘটনা সামনে আসে। একই সময়ে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলাতেও একই ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে রাজ্য প্রশাসনের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিধিমালা অনুসারেই সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই নিয়ম কার্যকর করা হচ্ছে। তাদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
তবে এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় কয়েকটি সংখ্যালঘু সংগঠন। ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ অভিযোগ করেছে, বাস্তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেই বেশি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তারা জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের আইন নতুন নয়। তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমতা, স্বচ্ছতা এবং বৈষম্যহীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নেয়। অমিত শাহর সঙ্গে তিন সাংসদের এই বৈঠক সেই বিতর্ককে আরও জাতীয় পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এখন প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আইন প্রয়োগের বাস্তব চিত্রই নির্ধারণ করবে এই ইস্যুতে উত্তেজনা কমবে, নাকি আরও বাড়বে।

