বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব বর্তমানে তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সামুদ্রিক রপ্তানি পথ এবং একটি প্রধান তেল পরিবহন পাইপলাইন নানা বাধার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবের তেল রপ্তানি সক্ষমতার ওপর তৈরি হওয়া এই চাপ বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। কারণ সৌদি আরব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নয়, পুরো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ। দেশটির রপ্তানি কার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটলে এর প্রভাব তেলের দাম থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০৫ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে। এর আগে সোমবার দাম বেড়ে ১১০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। সরবরাহ সংকটের আশঙ্কাই বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরগুলো থেকে তেল রপ্তানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। রাস তানুরার মতো বড় তেল রপ্তানি কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পথ ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যায়।
তবে দ্য ন্যাশনাল নিউজের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় বন্দরগুলো থেকে সরাসরি তেল পরিবহন কঠিন হয়ে পড়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হিসেবে পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল এই পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। তাই এই রুটে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা তৈরি হলে বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে পশ্চিমাঞ্চলীয় পথ বাব এল মান্দেব প্রণালি ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু এই পথও বর্তমানে নিরাপদ অবস্থায় নেই। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর অবরোধ এবং মোকা বন্দর দখলের পর এই রুট ব্যবহার করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এদিকে সুয়েজ খালও বড় তেলবাহী জাহাজের জন্য পুরোপুরি কার্যকর বিকল্প নয়। খালের গভীরতা অনেক বড় ট্যাংকার চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত না হওয়ায় জাহাজগুলোকে দীর্ঘ পথ বেছে নিতে হচ্ছে।
অনেক জাহাজ এখন ভূমধ্যসাগর হয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে এশিয়ার দিকে যাচ্ছে। এতে যাত্রার সময় প্রায় ২০ থেকে ২৫ দিন পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
সমুদ্রপথের পাশাপাশি সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ তেল পরিবহন ব্যবস্থাতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। দেশটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে।
এই পাইপলাইনের মাধ্যমে আবকাইক এলাকা থেকে ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করা হতো। বন্ধ হওয়ার আগে পাইপলাইনটির মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব ছিল।
ইরাকের মায়সান প্রদেশ থেকে ছোড়া ড্রোন হামলায় রিয়াদ ও মদিনার কাছে কয়েকটি পাম্পিং স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সৌদি আরব এই সিদ্ধান্ত নেয়। দেশটি জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে তারা প্রতিক্রিয়া জানানোর অধিকার রাখে। তবে ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে এখন পর্যন্ত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক তেল বাজারে। সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি পরিবহন খরচও নতুন উচ্চতায় উঠেছে।
পাইপলাইন হামলার পর ওমান উপসাগর থেকে চীনের উদ্দেশে তেল পরিবহনের খরচ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতি ব্যারেল তেল পরিবহনের ভাড়া বেড়ে ১১ দশমিক ৫০ ডলারে উঠেছে।
বিশ্ব তেলের বাজারে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো, সংকট মোকাবিলার জন্য ব্যবহৃত মজুতের পরিমাণও কমে আসছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বৈশ্বিক তেল মজুত থেকে প্রায় ৪১০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করা হয়েছে।
সাধারণত বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হলে দেশগুলো এই মজুত ব্যবহার করে বাজারে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে। কিন্তু মজুত কমে গেলে ভবিষ্যতে নতুন কোনো সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য তেলের বাজারের এই অস্থিরতা বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খরচ নয়, শিল্প উৎপাদন, কৃষি, খাদ্য সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব বেশি পড়ে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয় এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সৌদি আরব কত দ্রুত বিকল্প রপ্তানি ব্যবস্থা চালু করতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে যায়।
সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া এই সংকট শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারীর রপ্তানি কার্যক্রম যখন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তখন এর প্রভাব পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে অনুভূত হতে পারে।

