প্রায় ছয় মাস জনসমক্ষে খুব একটা না থাকার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি দেশের নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা পদগুলোতে একাধিক কট্টরপন্থি নেতা ও অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনকে ইরানের সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, চলতি মাসে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোয় যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা কেবল প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এর মধ্য দিয়ে তেহরান ভবিষ্যতে যেকোনো সামরিক হুমকি মোকাবিলায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান একই সঙ্গে দুটি বিষয় সামাল দেওয়ার পথ খুঁজছে। একদিকে তারা সংঘাতের অবসানের সম্ভাবনা খোলা রাখতে চাইছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান থেকে কোনোভাবেই সরে যেতে চাইছে না।
গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তারা
খামেনির সাম্প্রতিক নিয়োগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নাম মোহসেন রেজাই। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তিনি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাকে সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান করা হয়েছে।
এ ছাড়া হোসেইন তায়েবকে বাসিজ বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি একজন ধর্মীয় নেতা এবং সাবেক গোয়েন্দা প্রধান। বাসিজ ইরানের একটি শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী, যা অতীতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
শুধু এই দুটি পদেই পরিবর্তন থেমে থাকেনি। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর নতুন জেনারেল স্টাফ, রেভল্যুশনারি গার্ডসের নতুন প্রধান এবং বাহিনীটির নৌবাহিনীর নতুন কমান্ডারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে নৌবাহিনীর নেতৃত্বে পরিবর্তনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, হরমুজ প্রণালি এখন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকাগুলোর একটি।
হরমুজ নিয়ে কেন এত গুরুত্ব?
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই উত্তেজনা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অঞ্চলে কোনো ধরনের সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও তেহরান—কোনো পক্ষই হরমুজ প্রণালি নিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ফলে সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমে এলেও স্থায়ী সমঝোতার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জটিলতা। এ বিষয়ে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা সোমবার শেষ হয়েছে। কিন্তু সময়সীমা শেষ হলেও সমঝোতার পথ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে। সামরিক উত্তেজনা নতুন করে বাড়লে বর্তমান সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে—এমন আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
সংঘাত কমলেও উত্তেজনা কাটেনি
সাম্প্রতিক সময়ে সংঘর্ষের মাত্রা কিছুটা কমেছে। কিন্তু পরিস্থিতিকে শান্ত বলা যাচ্ছে না। বরং হরমুজ প্রণালি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় এখনো বড় ধরনের বিরোধের জায়গা হয়ে রয়েছে।
তেহরানের অবস্থান থেকেও বোঝা যাচ্ছে, তারা নিজেদের কৌশলগত সুবিধাগুলো সহজে ছাড়তে রাজি নয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর প্রভাব ধরে রাখাকে ইরান তাদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে।
এই অবস্থায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অভিজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে আসা আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
খামেনির বার্তা কতটা কঠোর?
প্রায় ছয় মাস জনসমক্ষে তুলনামূলকভাবে আড়ালে থাকার পর খামেনির নেতৃত্বে নিরাপত্তা কাঠামোয় এমন পরিবর্তন অনেক প্রশ্ন তৈরি করেছে। এটি কি কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদারের পদক্ষেপ, নাকি সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
তবে সামরিক ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর বিষয়টি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সম্ভাব্য হুমকিকে তেহরান হালকাভাবে দেখছে না।
ইরানের জন্য সামনে একই সঙ্গে কূটনীতি ও সামরিক প্রস্তুতি—দুই পথই খোলা রাখতে হতে পারে। একদিকে যুদ্ধ এড়াতে আলোচনা প্রয়োজন, অন্যদিকে আলোচনার টেবিলে শক্ত অবস্থান ধরে রাখার জন্য সামরিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
সামনে কী হতে পারে?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হবে কি না। যদি হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো সমাধানে পৌঁছানো না যায়, তাহলে সামরিক উত্তেজনা আবারও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ইরানের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা রদবদল এটাও দেখাচ্ছে যে তেহরান সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখতে চাইছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে সামান্য একটি সিদ্ধান্তও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। সংঘাতের তীব্রতা আপাতত কিছুটা কমলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মূল বিরোধগুলো এখনো অমীমাংসিত। আর সেই কারণেই ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি নতুন করে নজর কাড়ছে।

