রুশ হামলা ঠেকাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর একটি হাতে থাকলেও সেটি ব্যবহার করার মতো ক্ষেপণাস্ত্র নেই—যুদ্ধের নতুন বাস্তবতায় ইউক্রেনের দুর্বলতা কতটা গভীর, তা সামনে এসেছে।
কিয়েভের কাছাকাছি ইউক্রেনের একটি কৃষিজমিতে দাঁড়িয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বাইরে থেকে দেখলে এটি এখনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অস্ত্র। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এর ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের নলগুলো প্রায় খালি।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ হামলা ঠেকানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য তাদের কাছে এখন প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ফলে অস্ত্রটি থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনের সময় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
এমন এক সময়ে এই সংকট সামনে এসেছে, যখন ইউক্রেনের আকাশে রুশ হামলার মাত্রা আবারও বেড়েছে। প্রায় প্রতিরাতেই ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশ হামলার মুখোমুখি হচ্ছে দেশটি। এর মধ্যে ২০২৬ সালের জুলাই ছিল মে ২০২২-এর পর ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী মাস।
অস্ত্র আছে, কিন্তু ছোড়ার মতো ক্ষেপণাস্ত্র নেই
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার এই দুর্বলতা প্রকাশ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে নিরাপত্তার কারণে ব্যবস্থাটির নির্দিষ্ট ধরন ও অবস্থান প্রকাশ না করার শর্ত ছিল।
যে প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থাটি দেখা হয়েছে, তাতে মোট ১৬টি নল রয়েছে। নিয়মিত ব্যবহারের চিহ্নও রয়েছে সেখানে। কিন্তু ব্যবস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী দিমিত্রো—নিরাপত্তার কারণে যিনি শুধু প্রথম নাম ব্যবহার করেছেন—জানিয়েছেন, তিনি প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে কোনো প্যাট্রিয়ট উৎক্ষেপণকারীকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে দেখেননি।
এর কারণ অস্ত্র ব্যবস্থার অকার্যকারিতা নয়; মূল সমস্যা হলো ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি।
ইউক্রেন কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পেয়েছে কিংবা বর্তমানে কতগুলো অবশিষ্ট আছে, সে বিষয়ে দেশটির সরকার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক। তবে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, শীতকাল পার করে রুশ হামলা মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের ৫ শতাংশ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে ইউক্রেনের হাতে রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ।
এই ব্যবধানই সংকটের গভীরতা বোঝার জন্য যথেষ্ট।
‘অস্ত্র আছে, কিন্তু কিছু করার নেই’
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করা প্রকৌশলী দিমিত্রোর কাছে বিষয়টি শুধু সামরিক হিসাব নয়, ব্যক্তিগত অসহায়ত্বেরও প্রতীক।
তার ভাষায়, যখন নিজের কাছে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র আটকানোর মতো অস্ত্র নেই, তখন পরিস্থিতিটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কারণ আকাশে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যাচ্ছে, অথচ সেগুলো ঠেকানোর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের অভাবে কিছু করা যাচ্ছে না। আর সেই ক্ষেপণাস্ত্রের নিচে রয়েছে সাধারণ মানুষ।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো তিনি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন, যখন প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা ব্যবহার করার মতো কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছিল না।
তার কাছে সেই অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত কঠিন। হাঁটতে শেখার পরও হাঁটতে না পারা কিংবা শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা থাকার পরও শ্বাস নিতে না পারার সঙ্গে তিনি সেই অসহায়ত্বের তুলনা করেছেন।
কীভাবে কাজ করে প্যাট্রিয়ট?
প্যাট্রিয়ট শুধু একটি উৎক্ষেপণযন্ত্র নয়। পুরো ব্যবস্থাটির সঙ্গে থাকে রাডার, নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো।
উৎক্ষেপণযন্ত্রটি দূর থেকে পরিচালিত হয়। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার সময় চালকেরা সরাসরি উৎক্ষেপণযন্ত্রের পাশে থাকেন না।
কোন শত্রু ক্ষেপণাস্ত্রকে আটকাতে হবে, সেই সিদ্ধান্তও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে কাজ করা ইউক্রেনীয় সেনা হেওরহির মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে এবং শেষ পর্যন্ত ইউনিট কমান্ডার তা নেন।
কারণ আকাশে উড়ে যাওয়া প্রতিটি লক্ষ্য একই ধরনের হুমকি নয়। কোনোটি বেসামরিক জনগণকে, কোনোটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে, আবার কোনোটি সেনাদের পরিবারকেও বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে একটি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মুহূর্তকে তিনি প্রায় ‘জাদুকরী’ অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেও বেড়েছে চাপ
ইউক্রেনের প্যাট্রিয়ট সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলো বিপুলসংখ্যক প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। বিশেষ করে তুলনামূলক কম খরচের ইরানি ড্রোন ঠেকাতেও ব্যয়বহুল এই প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
ইউক্রেনের প্রকৌশলী দিমিত্রো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের ওপরও প্রভাব ফেলবে—এমন আশঙ্কা তারা আগেই করেছিলেন। কিন্তু একই সময়ে এত বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হবে, যা ইউক্রেন রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারত, সেটি তাদেরও বিস্মিত করেছে।
পরিসংখ্যানটি আরও উদ্বেগজনক।
ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রথম চার দিনে জোটবাহিনী গড়ে প্রতিদিন ২২৫টি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
অন্যদিকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন ২০২৫ সালে ৬২০টি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১.৭টি।
একদিকে দিনে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন, অন্যদিকে উৎপাদন মাত্র কয়েকটি—এই ব্যবধানই বিশ্বজুড়ে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা
চাহিদা ও উৎপাদনের এই বিশাল ব্যবধান কমাতে যুক্তরাষ্ট্রও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
জানুয়ারিতে পেন্টাগন লকহিড মার্টিনের সঙ্গে সাত বছরের একটি চুক্তিতে যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ২,০০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
কিন্তু ইউক্রেনের জন্য প্রশ্ন হলো—এই উৎপাদন বাড়ার সুফল তারা কত দ্রুত পাবে?
কারণ রাশিয়ার সঙ্গে তাদের যুদ্ধ ইতোমধ্যে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে এবং সামনে শীতকালও রয়েছে। আকাশ প্রতিরক্ষার চাহিদা কমার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ইউক্রেনেই তৈরি করতে চান জেলেনস্কি
এই সংকট থেকে বের হতে ইউক্রেন নিজেদের দেশে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সুযোগ চায়।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রেথিয়ন ও লকহিড মার্টিনকে ইউক্রেনে এমন কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা যাবে।
তার প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদনের পরিমাণ দ্রুত বাড়ানো। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহারে ইউক্রেন প্রস্তুত। এমনকি উৎপাদনকেন্দ্রের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণও মার্কিন কোম্পানির হাতে রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
জেলেনস্কির যুক্তি, ইউক্রেনের প্রয়োজন নিজেদের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা। অন্য কোথাও বিক্রি করার জন্য নয়।
ট্রাম্পের অনুমতির অপেক্ষায় কিয়েভ
জুনে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের পাশে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির অনুমতিপত্র দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।
এরপর রেথিয়ন ও লকহিড মার্টিনের প্রতিনিধিরা কিয়েভে গিয়ে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু পরে ট্রাম্প এই অনুমতি শেষ পর্যন্ত দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।
জেলেনস্কি অবশ্য এখনো আশাবাদী। তার বক্তব্য, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দেন এবং সেই অনুমতি পাওয়ার আশা করছেন।
তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনে উৎপাদনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং কোনো নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়নি। মার্কিন প্রযুক্তির নিরাপত্তাকে এখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অনুমতি পেলেই কি উৎপাদন শুরু করা সম্ভব?
এখানেও রয়েছে আরেকটি বড় সমস্যা।
ইউক্রেনকে প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হলেও সঙ্গে সঙ্গে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা সম্ভব হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী দিমিত্রো।
তার মতে, এটি অত্যন্ত জটিল একটি ব্যবস্থা। প্রয়োজন হবে বিপুল প্রযুক্তিগত জ্ঞান, বিস্তারিত তথ্য, বিশেষায়িত উৎপাদনব্যবস্থা এবং দীর্ঘ প্রস্তুতির।
অর্থাৎ ইউক্রেনের সামনে সংকটটি শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বাড়ানোর নয়। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সময়—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন।
ইউক্রেনের ‘অ্যাকিলিসের গোড়ালি’ কোথায়?
রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়তো এখানেই—দেশটির হাতে অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও সেটিকে কার্যকর রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ সীমিত।
প্যাট্রিয়ট ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইউক্রেনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। ফলে এর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি অস্ত্রের ঘাটতি নয়; এর অর্থ হলো গুরুত্বপূর্ণ শহর, সামরিক স্থাপনা, বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় একটি বড় ফাঁক তৈরি হওয়া।
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তি ব্যবহার, সীমিত উৎপাদনক্ষমতা এবং ইউক্রেনের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ—এই তিনটি চাপ একই সময়ে কাজ করছে।
এখন ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নতুন ক্ষেপণাস্ত্র হাতে পাওয়ার আগ পর্যন্ত কীভাবে আকাশ প্রতিরক্ষার ফাঁক পূরণ করা যাবে। আর যদি যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হয়, তাহলে শুধু ইউক্রেন নয়, বিশ্বজুড়েই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
কারণ আধুনিক যুদ্ধে শুধু অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকা যথেষ্ট নয়। যে অস্ত্র প্রতিদিন ব্যবহার করতে হয়, তার জন্য পর্যাপ্ত গোলাবারুদ বা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনের খালি প্যাট্রিয়ট উৎক্ষেপণযন্ত্র সেই বাস্তবতাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

