শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফরকে সংযুক্ত করার যে প্রবণতা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক বিবৃতিতে দেখা গেছে, তা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভারতের একজন প্রবীণ সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি। ভারতীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এই অবস্থানকে অসংবেদনশীল ও কূটনৈতিক রীতিবিরুদ্ধ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকের ভাষ্যমতে, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময়সূচি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে আলোচনা চলমান রয়েছে। এমন একটি স্পর্শকাতর পর্যায়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তাটিকে তিনি অত্যন্ত কর্কশ ও দাম্ভিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, এ ধরনের অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে সফরের গুরুত্বকে বাংলাদেশ সরকার যথাযথভাবে মূল্যায়ন করছে না।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে ভিন্নমত বা কোনো কৌশলগত টানাপোড়েন কাজ করছে কি না তা তার জানা নেই, তবে সরকারি পর্যায়ে সফরের প্রস্তুতি ও তারিখ নির্ধারণের প্রক্রিয়া এখনো সচল আছে। তারেক রহমান সফরে আসবেন না—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে ব্যক্তিগতভাবে ও তার পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে সুবিধাজনক সময়ে দ্বিপাক্ষিক সফরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তখন ধারণা করা হয়েছিল, প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে তারেক রহমান ভারতকেই বেছে নেবেন। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি এবং প্রায় ছয় মাস পার হলেও ওই আমন্ত্রণের কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
এরপর কয়েক সপ্তাহ আগে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তারেক রহমানকে দ্বিতীয়বারের মতো আমন্ত্রণ জানানো হয় ভারতের পক্ষ থেকে। সেই আমন্ত্রণও অনুত্তরিত থেকে গেছে বলে জানান ওই কূটনীতিক।
তিনি আরও বলেন, সফরের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা এমনিতেই সংকুচিত হয়ে আসছে। এই বাস্তবতায় প্রত্যর্পণ ইস্যুকে সফরের পূর্বশর্ত হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী বলে তিনি মন্তব্য করেন। এমনকি এই দাবি প্রত্যর্পণ অনুরোধের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।
এই প্রসঙ্গে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে প্রত্যর্পণ মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়া, যা সম্পন্ন হতে বছরের পর বছর সময় লাগতে পারে—এই বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারও ভালোভাবে অবগত। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, লন্ডনসহ বিভিন্ন দেশে ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রত্যর্পণের আবেদন জানানো হলেও সেসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে বছরের পর বছর লেগেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া এখনো চলমান। এমনকি আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রশাসনিক স্বাক্ষরের অপেক্ষায় থাকতে হয়। তার প্রশ্ন—তাহলে কি বাংলাদেশ বলতে চাইছে, আগামী দুই থেকে তিন বছর তারেক রহমান ভারত সফরে যাবেন না?
তিনি বিষয়টিকে হাস্যকর বলতে রাজি নন, তবে একে অত্যন্ত অনভিপ্রেত ও কূটনৈতিক নিয়মের ব্যতিক্রম বলেই বর্ণনা করেছেন। তার ভাষায়, দ্বিপাক্ষিক সফরের প্রস্তুতি এগিয়ে চলার মধ্যেই এ ধরনের শর্তারোপ পুরো প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টের প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য এসেছে, যেখানে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি পুনরায় তুলে ধরা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতা হারানোর পর থেকে হাসিনা ভারতেই অবস্থান করছেন।
একই সময়ে জানা গেছে, তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কর্মকর্তাদের মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। গত রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এই আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর, তবে এখনো এর সুনির্দিষ্ট তারিখ চূড়ান্ত হয়নি বলে ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সফরের তারিখ চূড়ান্ত না হওয়ার পেছনে সাম্প্রতিক একটি ঘটনাও প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগস্ট মাসের শুরুতে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়, যার প্রভাব সফরের প্রস্তুতিতেও পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণই নয়, বরং শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিদেরও দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের প্রতি আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছে। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যে শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে।
অন্যদিকে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে সরকারিভাবে কোনো সম্পর্ক না থাকার কথা জানিয়েছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল এবং সেখানে প্রকাশিত কোনো বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকার একমত নয়।
সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুই দেশের মধ্যকার এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি স্পর্শকাতর ভারসাম্যের প্রশ্ন—একদিকে ভারতের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করার তাগিদ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকারের ওপর থাকা চাপ। বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া যেহেতু দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল আইনি ধাপ অতিক্রম করে সম্পন্ন হয়, তাই একে স্বল্পমেয়াদি কূটনৈতিক সফরের পূর্বশর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথের জন্য জটিলতা তৈরি করতে পারে। আগামী দিনে এই সফর শেষ পর্যন্ত কীভাবে রূপ নেয়, তার ওপর নির্ভর করছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্কের দিকনির্দেশনা।

