যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণ প্রথমবারের মতো ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব প্রকাশের পর নতুন করে আর্থিক সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা, প্রবীণদের চিকিৎসা এবং ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় দ্রুত বাড়লেও সেই তুলনায় রাজস্ব বাড়ছে না। কর কমানোর নীতিও সরকারের আয় কমিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবারের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ দশমিক ০৪৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে জনগণের হাতে থাকা সরকারি ঋণপত্রের পরিমাণ ৩২ দশমিক ২৬৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে থাকা ঋণের পরিমাণ ৭ দশমিক ৭৮২ ট্রিলিয়ন ডলার।
অর্থাৎ এক দশকেরও কম সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশটির মোট ঋণ ছিল ১৯ দশমিক ৯৫ ট্রিলিয়ন ডলার।
কয়েক মাসেই ৩৯ থেকে ৪০ ট্রিলিয়ন
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ বাড়ার গতি কতটা দ্রুত, তার একটি বড় উদাহরণ হলো সাম্প্রতিক সময়ের হিসাব। মাত্র পাঁচ মাসেরও কম সময়ে দেশটির ঋণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, ১৯৮১ সালে প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর ২০ বছরেরও কম সময়ে সেই ঋণ চার গুণ হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজেট পর্যবেক্ষকেরা বেশ কিছুদিন ধরেই ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রমের আশঙ্কা করে আসছিলেন। তাঁদের মতে, সরকারের বর্তমান আয়-ব্যয়ের কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর বাড়ানো, সরকারি ব্যয় কমানো অথবা দুই ধরনের পদক্ষেপই নিতে হতে পারে।
দায়িত্বশীল বাজেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা একটি নির্দলীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান মায়া ম্যাকগিনিস বলেন, এত বড় ঋণের প্রভাব শুধু সরকারের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের পকেটেও পড়ে।
তার মতে, সরকার যত বেশি ঋণ নেবে, মূল্যস্ফীতির চাপ তত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাজেটের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ কমবে এবং দেশের ভেতরের জরুরি পরিস্থিতি কিংবা বিদেশের অস্থিরতার সময় সরকার আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহেও ভাটা
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের বড় অংশের ক্রেতা বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এখন কিছুটা সতর্ক হয়ে উঠছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণপত্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। গত এক বছরে এসব ঋণপত্রের প্রতি তাঁদের চাহিদা কমেছে।
সম্প্রতি ৩০ বছর মেয়াদি মার্কিন সরকারি ঋণপত্রের ২৫ বিলিয়ন ডলারের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ সুদহারে ঋণপত্র বিক্রি হয়েছে।
এর পরদিন, মঙ্গলবার দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণপত্রের সুদহার প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। বিপুল সরকারি ঋণপত্র বাজারে ছাড়ার কারণে বিনিয়োগকারীরা বেশি সুদ দাবি করায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ঋণপত্রের সুদহার বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। বাড়ির ঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ এবং ব্যবসায়িক ঋণের সুদও বাড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্রের সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেন। তিনি ১০ থেকে ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণপত্র পুনঃক্রয়ের পরিমাণ দ্বিগুণ করে প্রতি দফায় অন্তত ৪ বিলিয়ন ডলার করার ঘোষণা দেন।
ঋণের পাহাড়ের মধ্যেও সুদ কমানোর দাবি
দেশটির ঋণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা না গেলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও সুদহার কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকেরা জানতে চান, সরকারি ঋণপত্রের বাজারে অস্থিরতা নিয়ে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত কি না। জবাবে ট্রাম্প উদ্বেগের কারণ দেখছেন না বলে জানান। তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী দেশ এবং দেশের শক্তিশালী অবস্থানের সঙ্গে সুদহারও কমে আসা উচিত।
তবে সরকারি হিসাব বলছে, ঋণের চাপ কমছে না। বরং সরকারের নিয়মিত ব্যয় ও ঋণের সুদ পরিশোধের খরচ দ্রুত বাড়ছে।
জুলাইয়ে ৪৩২ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জুলাই মাসে দেশটির বাজেট ঘাটতি হয়েছে ৪৩২ বিলিয়ন ডলার। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক মাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ বাজেট ঘাটতি।
শুল্ক ফেরত দেওয়ার কারণে টানা তৃতীয় মাসে শুল্ক থেকে সরকারের আয় নেতিবাচক হয়েছে। একই সময়ে প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সুবিধায় সরকারি ব্যয়ও বেড়েছে।
চলতি ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই বাজেট ঘাটতি পুরো ২০২৫ অর্থবছরের মোট ঘাটতিকে ছাড়িয়ে গেছে। অথচ চলতি অর্থবছর শেষ হতে এখনো দুই মাস বাকি।
ট্রাম্পের দুই মেয়াদে বেড়েছে ১১.৬ ট্রিলিয়ন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ বেড়েছিল ৭ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার। এর অর্ধেকেরও বেশি জমা হয়েছিল তাঁর প্রথম মেয়াদের শেষ ৯ মাসে, যখন করোনা মহামারির প্রভাব মোকাবিলায় সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ আরও ৩ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে।
অর্থাৎ দুই মেয়াদ মিলিয়ে ট্রাম্পের সময় এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ বেড়েছে মোট ১১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে জো বাইডেনের মেয়াদেও দেশটির সরকারি ঋণ বেড়েছিল ৮ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। তাঁর সময় করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের ব্যয়ের পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং অন্যান্য সরকারি কর্মসূচিতেও বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়।
বাজেট বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ট্রাম্প ও বাইডেন—দুই প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্তই যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের গতিপথকে আরও উঁচু করেছে।
ট্রাম্পের নতুন আইনেও বাড়বে ঋণ
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট’ নিয়েও ঋণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কংগ্রেসের নির্দলীয় বাজেট বিশ্লেষণ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এই আইন বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ আরও ৪ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে।
ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদকে ব্যয় কমানোর সময় হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবে সরকারের মোট ব্যয়ের বড় অংশ কমানো কঠিন। কারণ যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। এর ৬০ শতাংশের মতো অর্থ সামাজিক নিরাপত্তা, প্রবীণদের চিকিৎসা, দরিদ্রদের চিকিৎসা সহায়তা এবং সাবেক সেনাসদস্যদের সুবিধার মতো বাধ্যতামূলক খাতে ব্যয় হয়।
এই ব্যয় সাধারণত জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়তে থাকে।
ঋণের সুদেই যাচ্ছে ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের ওপর শুধু সুদ পরিশোধ করতেই বছরে প্রায় ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। ঋণের পরিমাণ যত বাড়ছে এবং সুদহার যত বাড়ছে, এই খরচও তত বাড়ছে।
২০২৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় প্রতিরক্ষা বিভাগের ব্যয়কে ছাড়িয়ে যায়।
চলতি ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে পরিস্থিতি আরও বদলেছে। এই সময়ে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় প্রবীণদের চিকিৎসা খাতের ব্যয়কেও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পর এটিই এখন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বাজেটের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যয়ের খাত।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ব্যয়ও বাড়াচ্ছে চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। তাঁদের অবসরকালীন আয় ও চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সরকারের খরচও বাড়ছে।
একদিকে সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রবীণদের চিকিৎসা ব্যবস্থার তহবিলের ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে বেতন ও আয়কর থেকে সরকারের যে রাজস্ব আসে, তা মোট সরকারি ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই বিপুল ঋণের বোঝা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঋণ অতিক্রম করা শুধু একটি নতুন সংখ্যাগত রেকর্ড নয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির সামনে জমে থাকা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপেরও স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। সরকারি ব্যয়, প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা খরচ, ঋণের সুদ এবং কর-রাজস্বের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা না গেলে ভবিষ্যতে এই ঋণের বোঝা আরও দ্রুত বাড়তে পারে।

