ইরান যুদ্ধ নিয়ে আবারও নতুন কৌশল ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর পরিচিত ভঙ্গিতেই এসেছে সেই ঘোষণা—বড়সড় হুমকি আর কঠোর ভাষার মাধ্যমে।
তবে আসল প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকলে ট্রাম্প তাঁর নতুন কৌশলে কতদিন অটল থাকতে পারবেন।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের বিরুদ্ধে তিনি চালাতে যাচ্ছেন ‘যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে নেওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অভিযান’।
ইরানকে বোমা হামলার মাধ্যমে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা কিংবা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনায় বসাতে প্রণোদনা দেওয়ার চেষ্টা—দুটিই প্রত্যাশামতো ফল না দেওয়ার পর ট্রাম্পের নতুন পরিকল্পনা সামনে এসেছে। গত কয়েক মাসে ইরান যুদ্ধের কৌশল এতবার বদলেছে যে কোন অবস্থানটি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে, তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা বন্ধ করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রদের জানানো হয়েছে, তিনি এখন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষয়যুদ্ধের পথে এগোতে চান। তাঁর বিশ্বাস, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তেহরান আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।
যে যুদ্ধকে ট্রাম্প কয়েক দিনের মধ্যেই জয় হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, সেটি এখন ষষ্ঠ মাসে প্রবেশ করেছে। বুধবার তিনি পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, ‘এই মুহূর্তে পরিস্থিতি খুব ভালো।’
পরে আরেকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে তিনি ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করা যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। তাঁর লক্ষ্য—ইরানের সঙ্গে তেল চোরাচালান, অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা বিনিময়, জাহাজ নিবন্ধন ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত সব ধরনের অর্থনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ করা।
ট্রাম্পের বার্তা ছিল স্পষ্ট—যেসব দেশ বা প্রতিষ্ঠান ইরানকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে, ‘তারা জানে তারা কারা।’
অর্থনৈতিক চাপে কি ইরান নত হবে?
তবে ইরানের ওপর এমন চাপ প্রয়োগ করে দেশটির সরকারকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের বড় অংশই সন্দিহান।
তেহরানের বিপ্লবী সরকার দীর্ঘদিন ধরে কঠোর দমননীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও টিকে আছে। বিশ্বের অন্যতম কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞারও বহু বছর ধরে তারা মোকাবিলা করছে।
ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থায় দীর্ঘদিন কাজ করা এবং ইরানবিষয়ক গবেষণা বিভাগের নেতৃত্ব দেওয়া ড্যানিয়েল সিত্রিনোভিচ মনে করেন, ইরান অর্থনৈতিক চাপে ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা ভুল হতে পারে।
তাঁর মতে, ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কঠিন হলেও দেশটির কৌশলে পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি করে ট্রাম্পকে পাল্টা চাপে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান।
অর্থনৈতিক চাপ ইরানের জন্য বড় ক্ষতি তৈরি করতে পারে, কিন্তু তাতে দেশটির নেতৃত্বের হিসাব-নিকাশ বদলে যাবে—এমনটা এখনো মনে হচ্ছে না।
ট্রাম্পকে আগে নিজের কৌশল বদলাতে হবে
ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস নামাতে চাইলে শুধু তেহরানের হিসাব বদলালেই হবে না। ট্রাম্পকেও নিজের আচরণ ও কৌশলে পরিবর্তন আনতে হবে।
ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি ধ্বংস করতে কয়েক মাস নয়, প্রয়োজনে কয়েক বছরও লাগতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ও ধৈর্য—যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক আচরণে খুব বেশি দেখা যায় না।
তেহরানও হয়তো সেই হিসাবেই এগোচ্ছে। ইরানের নেতৃত্ব ধরে নিতে পারে, ট্রাম্প অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ফল আসার আগেই ধৈর্য হারিয়ে ফেলবেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণও।
ইরানের জাহাজ ও বন্দর ঘিরে অবরোধ কার্যকর করতে সামরিক শক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে হোয়াইট হাউস। এমনকি ট্রাম্প সম্প্রতি বিভ্রান্তিকরভাবে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
কিন্তু ইরানকে সত্যিকার অর্থে বিচ্ছিন্ন করতে হলে শুধু উপসাগরীয় অঞ্চল নয়, ইউরোপ ও এশিয়াজুড়ে বড় ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ইরানের ওপর আরও কার্যকর চাপ তৈরির কিছু উপায় অবশ্য রয়েছে।
হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক লুডোভিক হুড ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর আয় কমাতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর পক্ষে। একই সঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সহযোগী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
তাঁর মতে, বাগদাদ ও বৈরুতের সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা হলে মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের প্রভাব চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব। পাশাপাশি চীনের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোরও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কারণ চীন ইরানের তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা।
দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ ইরানে মূল্যস্ফীতি ও পুঁজি বিদেশে চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকিং সংকট তৈরি করতে পারে। এতে সরকারের ওপর চাপ বাড়বে এবং শাসনব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে—এমনটাই তাঁর যুক্তি।
চীনকে চাপে ফেলতে গিয়ে ট্রাম্পের নতুন সমস্যা
ইরানের অর্থনৈতিক অবরোধ আরও কার্যকর করতে হলে চীনের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের তেল বিক্রির সঙ্গে যুক্ত চীনা ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি।
কিন্তু এখানেই ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে রাষ্ট্রীয় সফরে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে ট্রাম্পের। এটি তাঁর বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আয়োজন হতে যাচ্ছে।
তাই সেই সফরের ঠিক আগে চীনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিলে দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, ইরানকে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধে ফেলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রদেরও পাশে পেতে হবে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরুর মাধ্যমে ট্রাম্প ইতোমধ্যে অনেক মিত্রকে ক্ষুব্ধ করেছেন। তাঁদের জাতীয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলার পর আবার যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার জন্য তাদের প্রকাশ্যে সমালোচনাও করেছেন।
এমনকি ইরানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে আলোচনায় বসা ওমানকে বোমা হামলার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
ফলে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবরোধ গড়ে তোলা ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না।
ট্রাম্প কি এবারও পিছিয়ে যাবেন?
ট্রাম্প যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান, তাহলেও একটি বড় বিষয় তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে—ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ।
তেহরান জানে, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময় বাকি। ফলে নির্বাচনের আগে ট্রাম্পকে রাজনৈতিকভাবে বিপাকে ফেলার একটি সুযোগ তারা দেখছে।
ইরান সম্ভবত ট্রাম্পকে এমনভাবে চাপে ফেলতে চাইবে, যাতে যুদ্ধের রাজনৈতিক ক্ষতি তাঁর জন্য আরও বাড়ে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ধীর করে দেওয়ার সক্ষমতা ইরানের অন্যতম বড় কৌশলগত অর্জন। সেই সুবিধা ধরে রাখতে তেহরান আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
নতুন করে জাহাজে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়বে। এতে মার্কিন ভোটারদের ওপর সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ পড়বে এবং যুদ্ধ নিয়ে তাঁদের অসন্তোষও বাড়তে পারে।
ট্রাম্প তখন কঠিন এক পরিস্থিতিতে পড়বেন। তিনি পাল্টা সামরিক হামলা চালালে সংকট আরও ভয়াবহ হতে পারে। আবার হামলা থেকে বিরত থাকলে তাঁকে দুর্বল দেখাতে পারে।
ডেমোক্র্যাটদের জন্যও এটি রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করছে। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জেমস ওয়াকিনশ বলেন, তিনি এমন অর্থনৈতিক ক্ষয়যুদ্ধ চান না যেখানে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মূল্য দিতে হবে সাধারণ মার্কিন নাগরিককে—জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের মাধ্যমে।
ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকি সত্ত্বেও ইরান যুদ্ধের কোনো পরিষ্কার সমাপ্তির পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
একদিকে ট্রাম্প চাইছেন অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে ইরানকে নত করতে। অন্যদিকে ইরান দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
এর মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, জ্বালানি বাজার, চীন-ইরান বাণিজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন—সবকিছুই যুদ্ধের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হয়তো ইরানের অর্থনীতি কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে, সেটি নয়।
প্রশ্ন হলো—ইরানের সরকার ভেঙে পড়ার আগেই মার্কিন জনগণের যুদ্ধ সহ্য করার ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে কি না।

