চীনের অন্যতম বৃহৎ আবাসন কোম্পানি এভারগ্রান্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হুই কা ইয়ানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। একসময় এশিয়ার শীর্ষ ধনী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হুইকে অর্থ আত্মসাৎ, তহবিল সংগ্রহে জালিয়াতি, অবৈধভাবে আমানত গ্রহণ, বেআইনিভাবে ঋণ দেওয়া, প্রতারণার মাধ্যমে সিকিউরিটিজ ইস্যু এবং ঘুষসহ আটটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। সূত্র: রয়টার্স
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শেনঝেনের একটি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে এই রায় দেন। একই সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এভারগ্রান্ডের আর্থিক পতনের প্রায় পাঁচ বছর পর হুইয়ের বিরুদ্ধে এই রায় এলো।
এপ্রিল মাসে আটটি অভিযোগেই হুই কা ইয়ান দোষ স্বীকার করেন। ৬৭ বছর বয়সী হুইকে রায় ঘোষণার সময় আদালতে দুই কর্মকর্তার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আদালতের প্রকাশ করা ছবিতে তাঁর চুল ধূসর দেখা যায়।
আদালত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এভারগ্রান্ড, এর প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠান হেংডা রিয়েল এস্টেট এবং হুই কা ইয়ানের অপরাধের সঙ্গে বিপুল অর্থ জড়িত। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে গুরুতর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি হয়েছে। তাই আইন অনুযায়ী তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
একসময় চীনের শীর্ষ আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ছিল এভারগ্রান্ড। তবে অতিরিক্ত ঋণের বোঝায় শেষ পর্যন্ত কোম্পানিটি ধসে পড়ে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলার দায়ের বেশির ভাগই পরিশোধ করা হয়নি। এভারগ্রান্ডের পতন চীনের দীর্ঘস্থায়ী আবাসন খাতের সংকটের অন্যতম বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে।
হুইয়ের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি এভারগ্রান্ডকে ৮৮২ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ১৩১ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান সহযোগী হেংডা রিয়েল এস্টেটকে ৭০০ কোটি ইউয়ান জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া কোম্পানিটির আরও পাঁচজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ছয় থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং জরিমানাও করা হয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার এভারগ্রান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হুই ছাড়া মোট ৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে।
এভারগ্রান্ডের আর্থিক সংকটের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাড়ির ক্রেতারাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন। বিপুল পরিমাণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা পণ্য ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভও হয়েছিল। অনেক সাধারণ ও স্বল্প আয়ের বিনিয়োগকারী তাঁদের সঞ্চয় হারিয়েছেন।
রায় ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভারগ্রান্ডের কয়েকজন গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁদের কেউ মন্তব্য করেছেন, ‘সব সাধারণ নাগরিককে এর মূল্য দিতে হয়েছে।’ আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমাদের টাকা কোথায়?’
১৯৯৬ সালে এভারগ্রান্ড প্রতিষ্ঠা করেন হুই কা ইয়ান। মধ্য চীনের হেনান প্রদেশের একটি গ্রামীণ এলাকায় দাদির কাছে বেড়ে ওঠা হুই কর্মজীবনের শুরুতে একটি ইস্পাত কারখানায় প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কাজ করেন। পরে আবাসন ব্যবসায় প্রবেশ করে দ্রুত এভারগ্রান্ডকে চীনের সবচেয়ে বড় আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন।
২০১৭ সালে হুইয়ের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। ফোর্বসের হিসাবে তখন তিনি এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন।
তবে অতিরিক্ত ঋণনির্ভর সম্প্রসারণের কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যে ধস নামে। ২০২৪ সালে হংকংয়ের একটি আদালত এভারগ্রান্ডকে অবসায়নের নির্দেশ দেন। পরের বছর হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে কোম্পানিটির শেয়ার তালিকাচ্যুত করা হয়।
এভারগ্রান্ডের অবসায়ন প্রক্রিয়াও ধীরগতিতে এগোচ্ছে। গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ২৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সম্পদ বিক্রি করা সম্ভব হয়েছিল। অথচ পাওনাদারদের দাবি ছিল প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে হুই ও তাঁর সাবেক স্ত্রীর বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দের জন্যও আদালতে লড়াই করছেন অবসায়নকারীরা। তাঁদের লক্ষ্য হুই ও সাবেক কর্মকর্তাদের দেওয়া প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার লভ্যাংশ ও পারিশ্রমিকের অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করা।
২০২৪ সালে চীনের সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হুইকে ৬৬ লাখ ডলার জরিমানা করে এবং আজীবনের জন্য পুঁজিবাজারে নিষিদ্ধ করে। সংস্থাটি তখন এভারগ্রান্ডের প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আয় বাড়িয়ে দেখানো ও সিকিউরিটিজ জালিয়াতির অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল।

