উত্তর কোরিয়ার পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের কাছে কমপক্ষে ৫৭টি শক্তিশালী পরমাণু বোমা রয়েছে। একই সঙ্গে পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী কিমের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
বুধবার হোয়াইট হাউজে একটি নতুন হেলিপ্যাড উদ্বোধনের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন ট্রাম্প।
কিমের হাতে থাকা পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা সম্পর্কে নিজের দাবির পক্ষে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে তিনি বলেন, কিম পরমাণু বোমা তৈরিতে সফল হয়েছেন এবং বর্তমানে এসব অস্ত্র তাঁর কাছে রয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার এই পরমাণু সক্ষমতা এমন একটি বাস্তবতা, যা এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, অতীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত ছিল না। একই সঙ্গে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদ নিয়ে সমালোচনা করে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ওই সময়ে প্রেসিডেন্ট থাকলে উত্তর কোরিয়াকে এমন অবস্থায় পৌঁছাতে দিতেন না।
উত্তর কোরিয়ার পরমাণু অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও কিম জং উনের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে ইতিবাচক হিসেবেই তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। তাঁর মতে, কিমের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকা গুরুত্বপূর্ণ এবং তিনি কিমকে ভালোভাবে চেনেন।
ট্রাম্প একই আলোচনায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, ইরানকে কখনো পরমাণু অস্ত্রের মালিক হতে দেবেন না।
এখানে ট্রাম্পের বক্তব্যে দুটি ভিন্ন কৌশলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। উত্তর কোরিয়া ইতোমধ্যেই পরমাণু সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি না থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় কিমের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানোর বিষয়ে তিনি কঠোর অবস্থানের কথা বলছেন।
কিম জং উনের সঙ্গে নতুন করে বৈঠকের আগ্রহও প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সম্প্রতি হোয়াইট হাউজ সূত্রে জানা গেছে, আগামী নভেম্বরে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশনের সম্মেলন উপলক্ষে চীন সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ট্রাম্পের।
সাংবাদিকেরা জানতে চান, ওই সফরের সময় কিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করতে তিনি আগ্রহী কি না। জবাবে ট্রাম্প সরাসরি জানান, তিনি এ ধরনের বৈঠকে আগ্রহী।
চীন সফরের সময় কিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তা উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক এবং পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের মধ্যে দুই নেতার সম্ভাব্য বৈঠক আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ট্রাম্পই প্রথম প্রেসিডেন্ট। তাঁর প্রথম মেয়াদে কিম জং উনের সঙ্গে তিনবার বৈঠক হয়েছিল।
প্রথম বৈঠক হয় ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরে। এরপর ২০১৯ সালে ভিয়েতনামের হ্যানয়ে দ্বিতীয়বার দুই নেতা বৈঠকে বসেন। একই বছরের জুন মাসে তৃতীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তবর্তী একটি বেসামরিক এলাকায়।
তৃতীয় বৈঠকটি বিশেষভাবে ঐতিহাসিক ছিল। কারণ ওই সময় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে উত্তর কোরিয়ার মাটিতে পা রাখেন।
তবে আগের বৈঠকগুলো উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ বা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। ফলে নতুন করে ট্রাম্প-কিম বৈঠক হলে এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরমাণু অস্ত্রের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পেতে পারে।
কিমের হাতে ৫৭টি শক্তিশালী পরমাণু বোমা থাকার ট্রাম্পের দাবি নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে প্রকাশ্য বক্তব্যে তিনি এই সংখ্যার উৎস বা নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। ফলে দাবিটি কতটা নির্ভুল, তা আলাদাভাবে যাচাই করার সুযোগ রয়েছে।
তবু সংখ্যাটি সামনে আসার কারণে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নতুন করে আগ্রহ তৈরি হতে পারে। দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই পরমাণু অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিচালনা করছে এবং এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উত্তেজনা রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে একই সঙ্গে কিমের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার ইচ্ছাও স্পষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ উত্তর কোরিয়াকে শুধু চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে মোকাবিলা করার বদলে সরাসরি নেতৃত্ব পর্যায়ে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার কৌশলেই এগোতে চান তিনি।
এখন সম্ভাব্য চীন সফরের সময় কিমের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হয় কি না এবং হলে সেখানে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে কী আলোচনা হয়, সেদিকেই নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের।

