ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ তৈরির পথে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। তাঁর দাবি, সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা গেলে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রয়োজন কমে আসতে পারে।
বৃহস্পতিবার দেওয়া বক্তব্যে বেসেন্ট এ অবস্থানের কথা জানান। এর একদিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ চালানোর হুমকি দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা বা টিকে থাকার সুযোগ করে দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তা দেন তিনি।
নতুন নিষেধাজ্ঞার বিস্তারিত আগামী সপ্তাহে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন বেসেন্ট। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
সামরিক অভিযানের বদলে অর্থনৈতিক চাপ?
বেসেন্টের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইরানের ওপর সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অবরোধকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। তাঁর ভাষায়, সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক চাপ কার্যকর হলে বড় পরিসরে সামরিক অভিযান আবার শুরু করার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
ইরানকে ঘিরে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোতেও। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি এই সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারির আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। সংঘাতের মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকির পর বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তিন সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে যায়।
দুই দফা যুদ্ধবিরতিও টেকেনি
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাত থামাতে এর আগে দুই দফা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এপ্রিল ও জুনে ঘোষিত এসব চুক্তির লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং ধীরে ধীরে সংঘাতের অবসানের পথ তৈরি করা।
তবে দুই দফা উদ্যোগই অল্প সময়ের মধ্যে ভেঙে পড়ে। ফলে সংঘাতের স্থায়ী সমাধান এখনো অধরা।
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একদিকে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে চাইছে, অন্যদিকে ইরানও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
ইরানের পাল্টা অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার আগেই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করেছে।
তেহরান এসব নিষেধাজ্ঞাকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ইরানের বক্তব্য, এ ধরনের চাপ দেশটির স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার সিদ্ধান্তে সামান্যতম দ্বিধাও তৈরি করবে না।
অর্থাৎ ওয়াশিংটন যেখানে অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের ওপর বড় ধরনের প্রভাব তৈরির চেষ্টা করছে, তেহরান সেখানে নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ করার অবস্থান নিয়েছে।
প্রায় ৫০ বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ইরান
ইরানের জন্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে প্রায় পাঁচ দশক ধরে দেশটি বিভিন্ন ধরনের মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে।
তবু এত দীর্ঘ সময়ের পরও ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং দেশটি বিকল্প বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক অংশীদার এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এবারের নতুন নিষেধাজ্ঞা তাই কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যেসব দেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, তাদের ওপরও যদি যুক্তরাষ্ট্র চাপ তৈরি করে, তাহলে পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
চীনকে ঘিরে বড় চ্যালেঞ্জ
ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজে পরিবহন করা ইরানের তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনেছে বলে জানিয়েছে বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার।
ফলে ইরানের তেল বিক্রি বন্ধ করতে চাইলে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চীন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। বিশেষ করে বিরল খনিজসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। তাই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করার কারণে চীনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিলে বেইজিংও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে পারে।
এই ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বেসেন্ট চীনের সঙ্গে আলোচনার কিছু বিষয় প্রকাশ্যে না বলার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে তিনি দাবি করেন, চীনের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। তাই ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে চীনেরও সহযোগিতা করা উচিত।
চীনের ওয়াশিংটন দূতাবাস অবশ্য জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞা ও চাপ কোনো সমস্যার সমাধান করে না। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণ করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উপায়ে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
মিত্র দেশগুলোর ওপরও কি চাপ আসবে?
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—ইরানকে সহায়তা করা যেকোনো দেশের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প নজিরবিহীন মাত্রায় ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও বিচ্ছিন্নতা’ তৈরির কথা বলেন। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা কোনো দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা, বিমানবন্দর বা সরকারি প্রতিষ্ঠান যদি ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা দেয়, তাহলে ওই দেশকেও বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এই বক্তব্যের ফলে শুধু ইরানের ওপর নয়, ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বা বাণিজ্য বজায় রাখা বিভিন্ন দেশের ওপরও নতুন চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এমনকি যেসব দেশ শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে, তারাও মার্কিন নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপেও ট্রাম্প
ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার ওপরও পড়ছে।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্য এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মার্কিন রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্পের বক্তব্য মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা। তাঁর মতে, বিপুল সরকারি ঋণ ও সুদের হার বৃদ্ধির মতো সমস্যার মধ্যে ওয়াশিংটনের বর্তমান নীতিগুলো আরও ব্যর্থতা ডেকে আনবে এবং ইরানের জনগণকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দেবে।
সামনে কী হতে পারে?
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রকৃতি ও পরিধি এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। সোমবার যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে বিস্তারিত জানালে বোঝা যাবে, ওয়াশিংটনের নতুন পদক্ষেপ শুধু ইরানের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশগুলোকেও সরাসরি লক্ষ্য করা হবে।
সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে। ইরানের তেল রপ্তানি কমে গেলে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবারও বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে চীন যদি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য অব্যাহত রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া সব হুমকি শেষ পর্যন্ত একইভাবে বাস্তবায়িত হয় না—এ বিষয়টিও মনে করিয়ে দিয়েছে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ। তাই সোমবারের ঘোষণার পরই বোঝা যাবে, ‘ইতিহাসের কঠিনতম নিষেধাজ্ঞা’ কতটা বিস্তৃত এবং বাস্তবে এর প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে।

