নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ নৌকাডুবির ঘটনায় অন্তত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনার সময় নৌকাটিতে ৭০ জনের বেশি যাত্রী ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু রয়েছে। দুর্ঘটনার পর এখনো কয়েকজন নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার নাইজেরিয়ার সোকোতো রাজ্যের গোরোনির গোরাউ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্গম এলাকায় ঘটনাটি ঘটায় উদ্ধারকাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও জরুরি সেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।
নাইজেরিয়ার পুলিশের মুখপাত্র আহমদ রুফাই বিবিসিকে জানান, দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৪৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৬ জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখনো ১৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
তবে দুর্ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সরকারি হিসাবের কিছু পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন, একটি স্থানীয় মসজিদের সামনে দাফনের জন্য প্রায় ৫০টি মৃতদেহ রাখা হয়েছিল। নিহতদের অনেকের মরদেহ মাদুর ও কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল। তবে এই সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, নৌকাটিতে থাকা শিশুদের অনেকে কৃষকদের সঙ্গে ধান কাটার কাজে যাচ্ছিল। কৃষিকাজের জন্য যাতায়াত এবং বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে ওই অঞ্চলের মানুষ নদীপথের নৌকার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
ফলে বর্ষাকালে নৌপথে চলাচল বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ সীমিত হওয়ায় কৃষক ও শ্রমিকদের জন্য নৌযান অনেক সময় একমাত্র সহজ পরিবহন ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়।
নাইজেরিয়ার জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থার মুখপাত্র ইজেকিয়েল মানজো জানিয়েছেন, গোরাউ অত্যন্ত দুর্গম একটি এলাকা। এ কারণে উদ্ধারকারী দলকে সেখানে পৌঁছাতে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
পুলিশও জানিয়েছে, দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন। নিরাপত্তা সংস্থা ও জরুরি পরিষেবার কর্মীরা ঘটনাস্থলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
নাইজেরিয়ায় নৌকাডুবির ঘটনা নতুন নয়। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই নৌযান দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, নৌকার দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে প্রয়োগ না করাকে এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হয়।
বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক নৌযানে যাত্রী ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ ওঠেন। নৌকার কাঠামো বা ইঞ্জিনের সক্ষমতা যথেষ্ট না থাকলেও যাত্রী পরিবহন চালু থাকে। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামও থাকে না।
এর ফলে কোনো কারণে নৌকা ভারসাম্য হারালে দ্রুত বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটে। নদীতে পড়ে যাওয়া যাত্রীদের উদ্ধার করাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
সোকোতো রাজ্যের সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাটি নাইজেরিয়ায় নদীপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাত্র গত মাসেই জিগাওয়া রাজ্যে একটি নৌকা উল্টে অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে জিগাওয়া থেকে ইয়োবে রাজ্যের উদ্দেশে কৃষক ও জেলেদের বহনকারী একটি নৌকা দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ওই ঘটনায় অন্তত ২৬ জন পানিতে ডুবে মারা যান।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরেও নাইজেরিয়ায় বড় ধরনের নৌদুর্ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় ২০০ জনের বেশি যাত্রী বহনকারী একটি নৌকা উল্টে যায়। পরে নাইজার নদী থেকে ৫৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
বারবার এ ধরনের দুর্ঘটনা দেশটির নদীপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসছে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান চালানো হলেও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সোকোতো রাজ্যের গোরাউয়ের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পথ সীমিত হওয়ায় উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছাতে সময় লাগে।
এ ঘটনায় এখনো ১৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে উদ্ধারকারী দল নিখোঁজদের সন্ধানে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্ঘটনাস্থল ও আশপাশের জলাশয়ে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি জীবিতদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
নিহতদের মধ্যে অনেক শিশু থাকার খবর ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে। কৃষিকাজের উদ্দেশ্যে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নৌযানে যাত্রা করা এসব শিশুর অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে সরকারি হিসাবে ইতোমধ্যেই ৪৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় এটি সাম্প্রতিক সময়ে নাইজেরিয়ার অন্যতম ভয়াবহ নৌদুর্ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এই দুর্ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌযান হলেও নিরাপত্তার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানি কমাতে নৌযানের ধারণক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার এবং দুর্গম এলাকায় নজরদারি জোরদার করা জরুরি।

