ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ক্রিভি রিহের একটি ব্যস্ত শপিং সেন্টারে রুশ ড্রোন হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার, ২১ আগস্টের এই হামলায় ২৩ শিশুসহ আরও অন্তত ১৩০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৩০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
হামলার পরপরই শপিং সেন্টারটিতে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ব্যস্ত একটি বাণিজ্যিক স্থাপনায় হামলা হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভবনের ভেতরে অনেকে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান উদ্ধারকর্মীরা। তারা আগুন ও ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে আটকে পড়া মানুষদের বের করে আনেন এবং আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান।
হতাহতদের মধ্যে শিশু থাকার বিষয়টি হামলার ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের একটি জায়গা কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পরিণত হতে পারে, এই ঘটনা তারই নির্মম উদাহরণ।
নিজ শহরে হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তিনি হামলাটিকে ‘নির্লজ্জ’ ও ‘ঘৃণ্য’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
জেলেনস্কি একই সঙ্গে রাশিয়াকে জবাবদিহির আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, ইউক্রেন শুধু হামলার নিন্দা জানিয়ে থেমে থাকতে চাইছে না; বরং বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায় নির্ধারণের বিষয়টিও সামনে আনতে চাইছে।
তবে হামলাটি নিয়ে এখন পর্যন্ত রাশিয়ার পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ক্রিভি রিহেতে হামলার ঘটনাটি শুধু একটি নির্দিষ্ট স্থাপনায় আঘাতের ঘটনা নয়। ইউক্রেন যুদ্ধের সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসামরিক অবকাঠামো ও জনবহুল এলাকায় হামলার ঝুঁকি ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে।
একটি শপিং সেন্টারের মতো জায়গায় দিনের ব্যস্ত সময়ে হামলা হলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। সেখানে একই সময়ে শিশু, পরিবার, কর্মী, ক্রেতা ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত থাকেন। ফলে একটি ড্রোনের আঘাত শুধু একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত করে না, একসঙ্গে বহু মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে।
এই হামলায় ১৩০ জন আহত হওয়ার তথ্যও সেই বাস্তবতাই তুলে ধরে। আহতদের মধ্যে ৩০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে রুশ হামলার তীব্রতা বেড়েছে। ফলে যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু সম্মুখসারির এলাকা বা সামরিক স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। শহরের সাধারণ মানুষও প্রতিনিয়ত প্রাণহানির ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন।
জাতিসংঘের ইউক্রেন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে রুশ হামলায় অন্তত ৪৩৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। ২০২২ সালের মে মাসের পর এক মাসে বেসামরিক নাগরিক নিহতের এটিই সর্বোচ্চ সংখ্যা।
এই পরিসংখ্যান ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষের ওপর যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান চাপকে স্পষ্ট করে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে। শহর, আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক স্থাপনা কিংবা জনসমাগমের জায়গা—কোনো স্থানই পুরোপুরি নিরাপদ থাকছে না।
ক্রিভি রিহের ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিল, যুদ্ধের হিসাব শুধু সামরিক সাফল্য, ভূখণ্ড দখল কিংবা অস্ত্রের ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি হামলার পেছনে থাকে মানুষের জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যতের গল্প।
একটি শপিং সেন্টারে থাকা একজন শিশু কিংবা সাধারণ ক্রেতার যুদ্ধের সিদ্ধান্তে কোনো ভূমিকা নেই। অথচ হামলার মুহূর্তে তাকেই জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হচ্ছে। আহতদের অনেককে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হতে পারে, আর নিহতদের পরিবারকে বহন করতে হবে অপূরণীয় ক্ষতি।
বিশেষ করে ২৩ শিশুর আহত হওয়ার তথ্য যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়কে আরও প্রকট করে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থাকা শিশুদের ওপরও সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে—এটি ইউক্রেনের বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম বেদনাদায়ক দিক।
ক্রিভি রিহের শপিং সেন্টারে আগুন হয়তো শেষ পর্যন্ত নিভে যাবে, ধ্বংসস্তূপও সরিয়ে ফেলা হবে। কিন্তু নিহতদের পরিবার এবং আহতদের জীবনে এই হামলার ক্ষত দীর্ঘদিন থেকে যাবে। আর ইউক্রেনের জন্য এটি হবে এমন এক যুদ্ধের আরেকটি অধ্যায়, যেখানে প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনই ক্রমশ সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।

