রাশিয়া যেন ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়ায়, সেই বার্তা দিতেই গোপনে মস্কো সফর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) পরিচালক জন র্যাটক্লিফ। মঙ্গলবার প্রায় আট ঘণ্টার এই সফরে রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও পলিটিকোর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, র্যাটক্লিফের সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার সম্ভাব্য কোনো সামরিক পদক্ষেপ ঠেকানো। বিশেষ করে বাল্টিক অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ানোর বিষয়ে মস্কোকে সতর্ক করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, ন্যাটোর প্রতিরোধক্ষমতা যাচাই করতে রাশিয়া আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জোটের পূর্বাঞ্চলীয় কোনো দেশে সীমিত সামরিক অভিযান চালাতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি না হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করার পথ বেছে নিতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
বিশেষ করে কোনো বাল্টিক দেশে সীমিত স্থল অভিযান এবং পূর্ব ইউরোপজুড়ে সাইবার হামলার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
পলিটিকোর একটি সূত্রের দাবি, র্যাটক্লিফ শুধু ন্যাটো নিয়ে সতর্ক করতেই মস্কো যাননি। ইরানকে রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা কমানোর জন্যও মস্কোর ওপর চাপ দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে র্যাটক্লিফের সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে হোয়াইট হাউস কোনো মন্তব্য করেনি।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠক হয়নি
ক্রেমলিন বুধবার নিশ্চিত করেছে, র্যাটক্লিফ মস্কো সফরে রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে তার সরাসরি কোনো সাক্ষাৎ হয়নি। বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছে বা এর কী ফলাফল হয়েছে, তা পুতিনকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন।
এর আগে ২০২১ সালের নভেম্বরে তৎকালীন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস মস্কো সফর করেছিলেন। সেবার তিনি ইউক্রেনে হামলা না চালাতে রাশিয়াকে সতর্ক করেছিলেন। এর কয়েক সপ্তাহ পরই ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে মস্কো।
র্যাটক্লিফের এবারের সফরের গুরুত্ব অবশ্য কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার তিনি এটিকে ‘মোটামুটি নিয়মিত’ সফর হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেন, ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে সফরটির কোনো না কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে।
ন্যাটো নিয়ে কেন বাড়ছে উদ্বেগ
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে চলতি মাসের শুরুতে বলা হয়, ২০২৬ সালের শরৎ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে যেকোনো সময়ে রাশিয়া ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কা করছে মার্কিন গোয়েন্দারা।
এই মূল্যায়ন আগের অবস্থানের তুলনায় বড় পরিবর্তন। আগে মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করতেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী ব্যস্ত থাকায় ন্যাটোর বিরুদ্ধে সরাসরি হামলার সম্ভাবনা কম।
ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে সশস্ত্র হামলা হলে জোটের বহুল আলোচিত অনুচ্ছেদ ৫ কার্যকর হতে পারে। এর আওতায় একটি সদস্যদেশের ওপর হামলাকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং সদস্যদেশগুলো সম্মিলিতভাবে আক্রান্ত দেশকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
তবে সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়েও রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে সাইবার হামলা, নাশকতা ও অন্যান্য ‘হাইব্রিড’ তৎপরতার মাধ্যমে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া যাচাই করছে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ।
ইউরোপে বাড়ছে নাশকতার আশঙ্কা
চলতি মাসের শুরুতে একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র পোল্যান্ডে আঘাত হানার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। একই সময়ে জার্মানির লিপজিগ/হালে বিমানবন্দরে বিস্ফোরক বহনকারী তিনটি ড্রোনও পাওয়া যায়। ন্যাটো ও ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দরটি ইউরোপের অন্যতম লজিস্টিকস কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ফ্রান্সও নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামো নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বুধবার দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএসআইয়ের প্রধান সেলিন বার্থন জানান, গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানি ও অবকাঠামোয় সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকি তারা মূল্যায়ন করছেন।
লিপজিগ বিমানবন্দরে বিস্ফোরকভর্তি ড্রোন পাওয়ার ঘটনাটিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বার্থন বলেন, এ ধরনের ঘটনা ইউরোপের ভূখণ্ডে আরও সরাসরি ও সহিংস হামলার আশঙ্কা বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ড্রোনটি ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সহায়তা দেওয়া একটি বিমানকে লক্ষ্য করে পাঠানো হয়েছিল।
তবে এসব ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো।
এর আগে দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ইউরোপীয় ও মার্কিন গোয়েন্দারা রাশিয়ার সম্ভাব্য কিছু পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এর মধ্যে পোল্যান্ডে সশস্ত্র উসকানি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলা এবং ইউক্রেনকে দায়ী করার জন্য ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ বা ছদ্মবেশী হামলার মতো সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছিল।
সব মিলিয়ে, র্যাটক্লিফের আকস্মিক মস্কো সফর ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার নতুন ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ায় ওয়াশিংটন এখন মস্কোর সম্ভাব্য পরবর্তী পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

